৩৬ নিউজ প্রতিবেদক:: ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের অধীনে মুসলিমদের ওপর পদ্ধতিগত নির্যাতন, মসজিদ-মাদ্রাসা ধ্বংস এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতাদের ক্রমাগত ঘৃণ্য বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে রামমূর্তি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট লেখক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, ভারতের এই চরম মুসলিম বিদ্বেষী পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বিশাল মূর্তি স্থাপনের বিরুদ্ধে এদেশের মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে।
ভারতে মসজিদ ধ্বংস ও সিলগালার হিড়িক
পিনাকী ভট্টাচার্য তাঁর বিশ্লেষণে ভারতের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন, যেখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও স্থাপনা ধ্বংসের চিত্র উঠে এসেছে:
অরুণাচলে ১৫টি মসজিদ সিলগালা: অরুণাচল প্রদেশের রাজধানী ইটানগরের সবকটি (১৫টি) মসজিদকে সম্প্রতি বেআইনি ঘোষণা করে সিলগালা করে দিয়েছে স্থানীয় বিজেপি সরকার।
পোস্টার রাখার ‘অপরাধে’ মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া: উত্তর প্রদেশের সম্ভাল জেলা প্রশাসন এই সপ্তাহেই একটি মসজিদ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ওই মসজিদে “I love Muhammad” পোস্টার এবং সবুজ রঙের ইসলামি পতাকা রাখার অপরাধে স্থানীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং সম্ভালের পুলিশ প্রধানের বরাতে বিবিসি এই মসজিদ ভাঙার খবর নিশ্চিত করে।
শতবর্ষী মসজিদ উচ্ছেদ: গত ১০-১২ বছরে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে শত শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী মসজিদ, মাদ্রাসা ও মাজারকে ‘অবৈধ’ অজুহাতে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। মুসলিমরা যাতে প্রতিবাদ করতে না পারে, সেজন্য গভীর রাতে বা মধ্যরাতের পর এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।
বাবরি মসজিদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৯২ সালে পুলিশ-মিলিটারির উপস্থিতিতে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার পর সুপ্রিম কোর্ট কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও বিতর্কিত জমিটি হিন্দুদের দিয়ে দেয়, যেখানে এখন রাম মন্দির তৈরি হয়েছে।
উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চরম উস্কানি ও লিঙ্গভিত্তিক অবমাননা
পোস্টে উল্লেখ করা হয়, উত্তর ভারতে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর নেতারা প্রকাশ্যে মুসলমানদের গণহত্যা এবং ইসলামকে উৎখাত করার ডাক দিচ্ছে। উত্তরাখণ্ডের ‘হিন্দুরক্ষা দল’-এর প্রধান ললিত শর্মার একটি সাম্প্রতিক ভিডিওর বরাত দিয়ে পিনাকী জানান, ওই নেতা মুসলিম নারীদের উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত নোংরা, কুরুচিপূর্ণ এবং অবমাননাকর স্লোগান দিয়েছেন এবং গর্ভ থেকে সন্তান টেনে বের করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছেন। এই চরম ঘৃণামূলক বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলেও ভারতের পুলিশ বা প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি।
নামাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও দ্বিমুখী নীতি
পিনাকী ভট্টাচার্য ভারতের প্রশাসনিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে বলেন, উত্তর প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে রাস্তার ওপর বা মসজিদের বাইরে নামাজ পড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ একই স্থানে হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা রাস্তার ওপর প্যান্ডেল করে পূজা উদযাপনে প্রশাসন কোনো বাধা দেয় না। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের উপ-মুখ্যমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ এই সপ্তাহেই মন্তব্য করেছেন, “যারা মসজিদের বাইরে নামাজ পড়তে চায়, তারা বাংলাদেশে চলে যাক!”
বাংলাদেশে এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও সাধারণের ক্ষোভ
ভারতের এমন বৈরী পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। পিনাকী ভট্টাচার্যের মতে, ভারতের এই দীর্ঘদিনের আগ্রাসী ও দখল আকাঙ্ক্ষার আবহে বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অঞ্চলে বিশাল আকারের রামমূর্তি বা শিবমূর্তি স্থাপনের সিদ্ধান্তকে এদেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না।
দিলীপ ঘোষের বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বাংলাদেশের ক্ষুব্ধ জনতা বলছে, ‘যারা মন্দিরের বাইরে এমন বিশাল রামের মূর্তি তৈরি করতে চায়, তারা যেন ভারতে চলে যায়।’ তবে এদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই যৌক্তিক ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়াকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যেন বাংলাদেশের মুসলমানেরা কোনো কারণ ছাড়াই সনাতনীদের ওপর চড়াও হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।
হাআমা/
