এই মাদরাসাগুলো শুধু ফল-ফুলের সৌন্দর্যেই নয়, তালীম ও তরবিয়তের মানেও সমৃদ্ধ।
মাওলানা আমিনুল হক, মুদীর, দারুল উলুম নিজামিয়া মোমেনশাহী।
তাঁর রুচি ও সৌন্দর্যবোধের ছাপ পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে দৃশ্যমান। তালগাছ থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির ফল ও ফুলের গাছ তিনি নিজ হাতে রোপণ করেছেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় মাদরাসাটি শিক্ষা ও পরিবেশ—উভয় ক্ষেত্রেই অনন্য মর্যাদা লাভ করেছে।
হাফেজ শামসুদ্দীন, ছোট হুজুর, কালিকাপুর হাফিজিয়া মাদরাসা।
১৯৮৪ সাল থেকে তিনি এ মাদরাসার একজন নিবেদিতপ্রাণ মালী ও অভিভাবক। প্রায় পাঁচ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তুলেছেন একটি সমৃদ্ধ হিফজখানা। তিনি কুরআনের কারিগর এবং অসংখ্য হাফেজ ও আলেমের শিক্ষক। প্রায় পঁচিশটি দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি গভীর অনুরাগী করে তুলেছে। বেগ পরিবারের দানকৃত জমিতে তিনি নির্মাণ করেছেন ফুলে-ফলে ঘেরা এক মনোরম শিক্ষানিকেতন।
একদিনের সফর : কালিকাপুর মাদরাসায়
রৌদ্রোজ্জ্বল এক দুপুরে পৌঁছালাম ময়মনসিংহের কালিকাপুরে। প্রথমেই লেবুগাছ থেকে তাজা লেবু পেড়ে শরবত তৈরি হলো। পুকুর থেকে ধরা হলো মাছ, যা মাদরাসার নিজস্ব চাষের ফল। দুপুরের দস্তরখানে ছিল পেঁপে, লাউসহ নানা ধরনের তরকারি—সবই মাদরাসার আঙিনায় উৎপাদিত।
বিকেলে ঘুরে দেখলাম ফুলের বাগান। কী অপূর্ব শোভা! রঙিন ফুল, পাতাবাহার এবং নানা প্রজাতির ঔষধি গাছ মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত উদ্যান।
আমার মাদরাসা, আমার পরিচয়
আমি হাজার জনপদের মাদরাসায় যাযাবরের মতো ছুটে বেড়াই। হৃদয়ের প্রশান্তি খুঁজে পাই মাদরাসার প্রাঙ্গণেই। মাদরাসা আমার ঐতিহ্য, আমার ইতিহাস, আমার গৌরব, আমার আত্মপরিচয়।
আপনার পাশের মাদরাসাটিতেও কি এমন পরিবেশ আছে?
একবার গিয়ে দেখুন—সেখানে ফল ও ফুলের গাছ আছে কি না। থাকলে আনন্দের বিষয়। আর না থাকলে আপনিই উদ্যোগী হোন। একটি গাছ দান করুন, কিংবা যত্ন নিয়ে সাজিয়ে তুলুন মাদরাসার আঙিনা।
মাদরাসায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
১. প্রতিটি মাদরাসার খালি জায়গায় ফলদ, ফুলদ ও ছায়াদার গাছ লাগানো যেতে পারে।
২. তালেবে ইলমদের মাধ্যমে গাছের পরিচর্যার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষার মাধ্যমে তাদের দায়িত্ববোধ ও কর্মপ্রেরণা বৃদ্ধি পাবে।
৩. শহরাঞ্চলের মাদরাসাগুলোতে জায়গার স্বল্পতা থাকলে টব ও বনসাই পদ্ধতিতে বাগান গড়ে তোলা যেতে পারে।
৪. বড় গাছের নিচে মাচা বা বসার আসর তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে তালেবে ইলমরা মুতালাআ, অধ্যয়ন ও চিন্তাচর্চায় সময় ব্যয় করতে পারবে।
৫. পর্যাপ্ত জায়গা থাকলে সবজি ও কৃষিপণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা পরিশ্রম, আত্মনির্ভরতা ও জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হবে।
ইলমী কানন গড়ার আহ্বান
আমাদের মাদরাসাগুলোতে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ হোক। হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ গাছ লাগানোর প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। সেই শিক্ষার আলোকে আমরা গড়ে তুলতে পারি সবুজ, সৌন্দর্যমণ্ডিত ও প্রাণবন্ত ইলমী কানন।
তবে একটি বিষয় সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে—প্রথমে শিক্ষা ও তালীমের উৎকর্ষ, তারপর ফল-ফুলের বাগান। কারণ শুধু বাগান তো যেকোনো জায়গাতেই হতে পারে; কিন্তু জ্ঞান, আমল ও আখলাকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মাদরাসাই প্রকৃত ইলমী বাগান।
লেখক : পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউটে
