পরীক্ষার হলের চারপাশে শত শত ছেঁড়া পাতা

আবদুল্লাহ আল ফারুক

by Masudul Kadir

শৈশবে আমার ইচ্ছা ছিল, দাখেল-আলেম পরীক্ষা দেব। মামারা বলতেন। খালুরা বলতেন। এমনকি আব্বার এক বন্ধু বললেন, আমি যদি তার মাদরাসা থেকে দাখেল পরীক্ষা দিই তাহলে আমার পরীক্ষার সকল বন্দোবস্ত তিনি করে দেবেন।

বিষয়টি আব্বাকে জানাতেই বরাবরের মতো তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বসিয়ে দিলেন। অথচ আমার আব্বা, দাদা, নানা- সবাই ছিলেন আলিয়া মাদরাসা পড়ুয়া। সবাই যখন বলতেন যে, কওমি মাদরাসায় পড়লে সার্টিফিকেট পাবে না। জীবনে বড় চাকরি হবে না। তখন মন খারাপ করতো। এজন্য আব্বা যখন দাখেল পরীক্ষা দিতে নিষেধ করলেন, তখন স্বভাবতই ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল।
বিষয়টি আব্বার চোখ এড়ায়নি।

বিজ্ঞাপন
banner

কিছু দিন পরের ঘটনা। আব্বা আমাদের সবাইকে নিয়ে দেশের বাড়িতে গেলেন। নোয়াখালীর চাটখিল থানাধীন সোমপাড়া। বাড়ির পাশেই ঐতিহ্যবাহী খোয়াজের ভিটা মাদরাসা। যেখানে আমার দাদারা পড়ালেখা করেছেন। আব্বা-চাচারাও পড়ালেখা করেছেন।

আব্বা আমাকে সেই আলিয়া মাদরাসা দেখাতে নিয়ে গেলেন। মসজিদের দক্ষিণ পাশে লম্বা মাদরাসা রুম। অনেকটা ইউ প্যাটার্নের টিনশেড রুম। আব্বা আমাকে সেই মাদরাসার বাইরে থেকে চারপাশ ঘুরে দেখালেন।

আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, পরীক্ষার হলের চারপাশে শত শত ছেঁড়া পাতা। গাইড বা নোট বুকের অজস্র ছেড়া পাতা বিক্ষিপ্ত পড়ে আছে। সেই কাগজগুলোর গায়ে কুরআনের আয়াত, নবিজির হাদিস ও বিভিন্ন ট্যাক্সট জ্বলজ্বল করছে। পরীক্ষা শেষ হয়েছে অনেক দিন আগেই; কিন্তু এখনো ছেড়া পাতার ভাগাড় পড়ে আছে। তখন বুঝতে পারলাম, এগুলোই হলো সেই নকল, যার জন্য দাখেল-আলেম পরীক্ষাগুলো বিখ্যাত বা কুখ্যাত।

এই দৃশ্য দেখে বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো। যেখানে আমরা আমাদের আসাতিযায়ে কেরাম থেকে ইলমের প্রতিটি উপকরণের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা পেয়েছি। সেখানে দেখলাম, পরীক্ষাকেন্দ্রের চারপাশে যত্রতত্র কিতাবের পৃষ্ঠার অসম্মানজনক ছড়াছড়ি।

সেদিন থেকে দাখেল-আলেম পরীক্ষার ওপর থেকে মনটা এমনভাবে বিষিয়ে উঠলো যে, আর কখনই আলিয়ায় পরীক্ষা দেওয়ার চিন্তা মাথায় আসেনি।

এখন আমি একজন শিক্ষক। কওমি মাদরাসার সামান্য শিক্ষক। আমি যখন শুনি, কোনো প্রতিষ্ঠান আলেয়ায় পরীক্ষা দেওয়ার কারণে ছাত্র বহিষ্কার করেছে, আমি সেই সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানাই। আমি মনে করি, এটাই উপযুক্ত কওমি মাদরাসা। এমন কিছু প্রশ্নে মেরুদণ্ড সোজা রাখার দীক্ষাই আমরা আমাদের উসতাযে মুহতারাম মাওলানা নূর হুসাইন কাসেমি রহ. এর কাছ থেকে পেয়েছি।
বাকি থাকলো, আমাদের কওমি মাদরাসার কাফিয়া, শরহে বেকায়া ও ফজিলত মারহালাকে সরকারি ভাবে সমমান স্বীকৃতি দেওয়া- আমি সেই প্রস্তাবের পক্ষে। আমি চাই, আমাদের স্বকীয়তা ও সিলেবাস অক্ষুন্ন রেখে সেই মান দেওয়া হোক। দ্রুতই দেওয়া হোক।

কওমি ছাত্রদের আলিয়ায় পরীক্ষা দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে এটাই যথার্থ সমাধান। বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে এর কোনো বিকল্প নেই।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222