নিজস্ব প্রতিবেদক :: সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তার কিংবা তিন বছরের ফুটফুটে হাবিব। পৃথিবীর কোনো স্বার্থ বা দ্বন্দ্বে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। অথচ তাদের সঙ্গেই ঘটেছে পাশবিক নৃশংসতা। ঢাকার পল্লবীতে রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেছে এক প্রতিবেশী দম্পতি। অন্যদিকে রাজধানীর বাড্ডায় মাদক কেনার টাকা না পেয়ে তিন বছরের হাবিবকে গলা টিপে হত্যা করেছে তারই জন্মদাতা পিতা।
এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা কেবল রামিসা বা হাবিবের নয়। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৬ মাসে অন্তত ৫২২ শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি মাসে ৩২ জনের বেশি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। এই সময়ে ধর্ষণসহ চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরও ১ হাজার ২২৩ শিশু।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, যখন নির্ভরতার হাতই হয়ে ওঠে ঘাতক। যে মা-বাবার কোল সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সেই প্রিয়জনরাই কখনো কখনো খুন করছেন নিজের সন্তানকে। গাজীপুরে মাদকের ঘোরে ফোরকান আলী তার তিন শিশুসন্তান ও স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা করেন। বগুড়ায় জন্মের মাত্র একদিন পরই মায়ের ও সৎ বাবার হাতে খুন হয় এক নবজাতক। মুন্সীগঞ্জে ১০ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে আটক হয়েছে তারই সৎ মামা।
বড়দের ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ এবং মাদকের নেশার কাছে চরমভাবে পরাস্ত হচ্ছে শিশুর নিরাপদ পৃথিবী। প্রতিপক্ষকে ফাঁসানো বা অপরাধ আড়াল করতে আপনজনরাই হয়ে উঠছেন ঘাতক। ঈশ্বরগঞ্জে মাদকের টাকার জন্য চার বছরের শিশু মরিয়মকে হত্যা করে দুই কিশোর। আবার অনলাইন জুয়ার টাকার দ্বন্দ্বের জেরে মুক্তাগাছায় ৯ বছরের শিশু রাফিকে হত্যা করে প্রতিবেশী।

শিশু রামিসা আক্তার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, স্বজনদের হাতে শিশু নির্যাতন এ দেশে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। হত্যার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় শিশুহত্যা দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে, সাইকোথেরাপিস্ট নুসরাত সাবরিন চৌধুরীর মতে, ডিজিটাল ডিভাইসের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং পারিবারিক দূরত্বের কারণে শিশুর নিরাপত্তা আজ মারাত্মক ঝুঁকিতে।
শুধু আইন করলেই হবে না, প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, শিশুদের ওপর নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা তারা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছে। পাশাপাশি চলছে বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর কাজ। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও, তার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে এই চরম সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে। সামাজিক সচেতনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণই পারে আমাদের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুস্থ পৃথিবী নিশ্চিত করতে।
গ্রন্থনা : তানবিরুল হক আবিদ
এমকে/তাআ/36news
