অতীতে নারী শিক্ষা ও উপমহাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আযাদীর চিন্তা

ইতিহাসের গৌরবময় শিক্ষা ধারা

by Abid

অতীতে উপমহাদেশে মুসলিম শাসনামলে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার এক গৌরবোজ্জ্বল ধারা গড়ে উঠেছিল। নারী শিক্ষা, দীনী শিক্ষার বিকাশ, সাহিত্যচর্চা, দর্শন, বিজ্ঞান ও সভ্যতার নানা উপাদান সেই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছিল। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক আগ্রাসন সেই ধারাবাহিকতাকে বিপর্যস্ত করে দেয়। আজও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সেই ঔপনিবেশিক প্রভাব বহুলাংশে বিদ্যমান। শিক্ষা ব্যবস্থার স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে।

মোগল আমলে নারী শিক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা

বিজ্ঞাপন
banner

মোগল আমলে নারী শিক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। সম্রাজ্ঞী জীবুন্নেছা শিক্ষা কার্যক্রমে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। গুলবদন বেগম ব্যক্তিগত লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শাহী মহলে নারীদের জন্য আলাদা শিক্ষার পরিবেশ ছিল। অন্দরমহলে গৃহশিক্ষার মাধ্যমে নারী সমাজ সাহিত্য, ধর্মীয় জ্ঞান, ভাষা ও শিষ্টাচার শিক্ষা লাভ করতেন। প্রকাশ্যে বেপর্দাভাবে পড়াশোনার ব্যবস্থা না থাকলেও পর্দার অন্তরালে নারীদের শিক্ষার সুব্যবস্থা ছিল।

উপমহাদেশে ইসলামী শিক্ষার সূচনা ও বিস্তার

উপমহাদেশে ইসলামী শিক্ষার সূচনা আরও প্রাচীন। ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে কেরালায় প্রথম মসজিদ নির্মিত হয়। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু বিজয় করলে সেখানে ইসলামী শিক্ষা বিস্তার লাভ করে। পরবর্তীতে সিন্ধু ও মুলতানে বড় বড় মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইলমের আলো ধীরে ধীরে সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

মোগল আমলে ভাষা, সাহিত্য ও শিক্ষার বিষয়বস্তু

মোগল আমলে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভাষা ছিল ফার্সি। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ভাষাও ছিল ফার্সি। ফলে নারী-পুরুষ উভয়ই ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী ছিলেন। নারীরা কবিতা লিখতেন, সাহিত্যচর্চা করতেন এবং আখলাকিয়াত তথা চরিত্র গঠনের শিক্ষাও গ্রহণ করতেন। শিক্ষাক্রমে দীনিয়াত, কুরআন, হাদিস ও ইসলামী আইনশাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বাদশাহ আওরঙ্গজেব আলমগীর রহ.-এর কন্যাগণ কুরআনের হাফেজ ছিলেন। তারা কুরআনের তাফসির ও অনুবাদ বুঝতেন। সে সময় নারীরা ঘরোয়া পরিবেশে মিশকাতুল মাসাবীহসহ বিভিন্ন হাদিসের কিতাব অধ্যয়ন করতেন। শিক্ষা শুধু ধর্মীয় বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; মান্তেক (যুক্তিবিদ্যা), ফালসাফা (দর্শন), গণিত, ফালাকিয়াত (জ্যোতির্বিজ্ঞান), সরফ-নাহু, বালাগাত ও আরবি সাহিত্যও পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল।

দরসে নেজামী: উপমহাদেশের ইসলামী শিক্ষার ভিত্তি

দরসে নেজামী উপমহাদেশের ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ নেছাব। লখনৌর মোল্লা নিজামুদ্দীন সাহলভী রহ. এই পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করেন। প্রথমদিকে এতে মাকুলাত তথা যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের প্রাধান্য ছিল। পরে যুগসংস্কারক ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ. কুরআন ও হাদিসভিত্তিক মানকুলাত বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে পাঠ্যক্রমে ভারসাম্য আনেন। তাঁর প্রচেষ্টায় কুতুবে সিত্তা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়। আজকের দারুল উলুম দেওবন্দের পাঠ্যক্রম মূলত সেই সংশোধিত দরসে নেজামীর ধারাবাহিকতা।
এক সময় আলিয়া মাদরাসাতেও দরসে নেজামীর বহু কিতাব পাঠ্য ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে “নিউ স্কিম” ও “ওল্ড স্কিম”-এর পরিবর্তনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী বহু বিষয় ও কিতাব বাদ পড়ে যায়।

ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ও শিক্ষাব্যবস্থার বিপর্যয়

১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে উপমহাদেশ ঔপনিবেশিক শাসনের কবলে পড়ে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর দিল্লির মুসলিম শাসনেরও পতন ঘটে। দীর্ঘ দুইশত বছরের ব্রিটিশ শাসনে মুসলিম সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
ওয়াকফ ও লাখেরাজ সম্পত্তি, যা দীনী শিক্ষার অর্থায়নের প্রধান উৎস ছিল, ব্রিটিশরা দখল করে নেয়। হাজার হাজার মক্তব ও মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আদালত ও প্রশাসন থেকে ফার্সি ভাষা বাতিল করে ইংরেজি চালু করা হয়। মুসলিম সমাজ রাতারাতি রাষ্ট্রক্ষমতা, ভূমি ও শিক্ষাক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

লর্ড ম্যাকলের ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতি ও মুসলিম নারী শিক্ষার পতন

ইংরেজরা লর্ড ম্যাকলের চিন্তাধারার ভিত্তিতে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল কেরানি তৈরি করা। ১৭৮০ সালে কলকাতা আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হলেও তা ছিল ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষার একটি অংশ। অন্যদিকে মুসলিম আলেম ও বিপ্লবীদের হত্যা, নির্বাসন ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষার স্বাধীন ধারা বাধাগ্রস্ত করা হয়।
এই সময় মুসলিম নারীদের শিক্ষাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে মুসলিম সমাজ পিছিয়ে পড়ে। ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থায় সহশিক্ষা চালু হয়। যেখানে ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে। ইসলাম শিক্ষা অর্জনকে ফরজ করলেও হিজাব ও পর্দার বিধানও ফরজ করেছে। ফলে মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন এই শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল।

স্বাধীনতা পরবর্তী শিক্ষায় ঔপনিবেশিকতার দাগ

কিন্তু ধীরে ধীরে মুসলিম সমাজও ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আপস করে। আজ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি আলিয়া মাদরাসাতেও সহশিক্ষা প্রচলিত। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পরও শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাঠামোর বড় পরিবর্তন ঘটেনি। ভূমি স্বাধীন হলেও চিন্তা ও শিক্ষার স্বাধীনতা এখনো পূর্ণতা পায়নি।

ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষা ও বর্তমান বিভাজন

ইসলাম শিক্ষা অর্জনকে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ফরজ করেছে। ইসলামে শিক্ষা “দুনিয়াবি” ও “আখিরাতি” এভাবে বিভক্ত নয়; বরং উপকারী ও অনুপকারী জ্ঞানের ভিত্তিতে তা মূল্যায়িত হয়। মুসলিম সমাজ, রাষ্ট্র ও উম্মাহর কল্যাণে যা প্রয়োজন। সেসব জ্ঞান অর্জন করাই ইসলামের শিক্ষা।
কুরআনের প্রথম শব্দ “ইকরা” পড়ো। কুরআন ও সুন্নাহ মানুষকে জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে উপমহাদেশ আজও ঔপনিবেশিক শিক্ষাচিন্তার সংকীর্ণতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি।
অন্যদিকে ধর্মীয় সমাজ ও আলেমসমাজ দীনী শিক্ষা রক্ষার জন্য অসংখ্য মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করলেও এমন একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা উপহার দিতে পারেননি, যা রাষ্ট্র জাতীয় শিক্ষানীতি হিসেবে গ্রহণ করবে। ফলে সমাজে “মোল্লা” ও “মিস্টার” এই দুই শ্রেণির বিভাজন তৈরি হয়েছে।

আজকের প্রয়োজন: একটি সমন্বিত ও স্বাধীন শিক্ষাব্যবস্থা

বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মুসলিম সন্তান লর্ড ম্যাকলের ধারার শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী মাদরাসায় পড়াশোনা করছে। ফলে বৃহৎ জনগোষ্ঠী দীনী শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।
জাতীয় শিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে নতুনভাবে ভাবতে হবে। শুধু ইবাদত-বন্দেগির শিক্ষা নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও মানবিক শিক্ষাকে ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

শিক্ষায় পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি
খেলাফতে রাশেদার আদর্শে ন্যায়ভিত্তিক শাসন, জ্ঞানচর্চা ও নৈতিকতার সমন্বয় ছাড়া জাতীয় জীবনে গুণগত পরিবর্তন আনা কঠিন। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে হলে স্বাধীন চিন্তা, আত্মমর্যাদা ও ঈমানভিত্তিক জ্ঞানচর্চার বিকল্প নেই।
দেশ বহুবার স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু শিক্ষা এখনো পূর্ণ স্বাধীনতা পায়নি। তাই আজ প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার আযাদী, চিন্তার স্বাধীনতা এবং ইসলামী মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বিত এক নতুন শিক্ষাবিপ্লব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই তাওফিক দান করুন।

লেখক: লাবীব আব্দুল্লাহ, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট

টিএইচএ/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222