আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকার বিয়ে, তালাক ও অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত ৩১ অনুচ্ছেদের একটি নতুন পারিবারিক ডিক্রি জারি করেছে। দেশটির সরকারি গেজেটে প্রকাশিত এই অধ্যাদেশে কুমারী নারীর নীরবতাকে বিয়ের সম্মতি হিসেবে গণ্য করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আমু টিভির বরাতে জানা গেছে, তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা মোল্লা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা-এর অনুমোদনের পর ‘স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদসংক্রান্ত নীতিমালা’ শিরোনামে ডিক্রিটি কার্যকর করা হয়।
কুমারী নারীর নীরবতাই সম্মতি
নতুন আইনের অন্যতম আলোচিত ধারা অনুযায়ী, কোনো কুমারী মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর সে নীরব থাকলে সেটিকে তার ‘ইযন’ বা সম্মতি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে এই বিধান বিবাহিত নারী বা পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
ইসলামি শরীয়াহ ও ফিকহী গ্রন্থের আলোচনায়ও এ ধরনের মতামতের উল্লেখ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য ফিকহী গ্রন্থ আল-ইনায়াহ শারহ আল-হিদায়াহ এবং আল-বাহর আল-রাইক-এ বলা হয়েছে, বিয়ের আগে কুমারী মেয়ের সঙ্গে পরামর্শ করা হলে তার নীরবতা সম্মতির আলামত হিসেবে গণ্য হতে পারে।
হাদীসে কী বলা হয়েছে?
সহীহ মুসলিমের ১৪২১ নম্বর হাদীসে মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “কুমারী থেকে তার (বিবাহের) ব্যাপারে অনুমতি নিতে হবে। আর তার নীরব থাকাই তার সম্মতি।”
ইসলামি আইনজ্ঞদের মতে, কুমারী নারীর স্বভাবগত লজ্জাশীলতার বিষয়টি বিবেচনা করেই শরীয়তে এই বিধান এসেছে।
কান্না ও হাসির ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ
হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ফাতহ আল-কাদির, উমদাত আল-কারী এবং আল-বাহর আল-রাইক-এ বিয়ের প্রস্তাবের সময় মেয়ের আচরণ ও পারিপার্শ্বিক ইঙ্গিতের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
এসব ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মেয়েটি যদি নীরবে কান্না করে, তবে সেটি পরিবারের মায়া বা বিদায়ের কষ্টের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে, যা সম্মতির বিরোধী নয়। তবে উচ্চস্বরে কান্না বা চিৎকার করলে তা অসন্তোষের আলামত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সেটিকে সম্মতি ধরা হবে না।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে নিয়েও বিধান
তালেবানের নতুন আইনে বিশেষ শর্তে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বৈধতার কথাও বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পিতা বা দাদাকে অভিভাবক হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
তবে শর্ত হিসেবে পাত্রের ‘কুফু’ বা সামাজিক উপযুক্ততা এবং শরীয়তসম্মত দেনমোহর নির্ধারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘খিয়ার আল-বুলুগ’ বা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পর বিয়ে বাতিলের অধিকারও বহাল রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ, শৈশবে সম্পন্ন হওয়া বিয়ে নিয়ে কোনো সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর আপত্তি জানালে ধর্মীয় আদালতে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবে।
দ্বিতীয় বিয়ে ও ব্যভিচার প্রসঙ্গে সতর্কতা
ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কুমারী মেয়ে মনে মনে নারাজ থাকলেও যদি বিয়ের মজলিসে প্রকাশ্যে আপত্তি না করে নীরব থাকে, তাহলে প্রথম বিয়েটি শরীয়তের দৃষ্টিতে সহীহ বা বৈধ হয়ে যায়।
এ অবস্থায় প্রথম স্বামীর সঙ্গে বৈধ বিচ্ছেদ ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে সংসার করা হারাম এবং তা ব্যভিচার বা জিনার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে ফিকহী ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন ডিক্রিতে বিচারকদের ব্যভিচার, ধর্মত্যাগ ও জিহারের মতো বিষয়ে কঠোর রায় দেওয়ার ক্ষমতাও প্রদান করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা
২০২১ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তালেবান সরকারের নারীনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। বর্তমানে আফগানিস্তানে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের শিক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের প্রবেশাধিকার বন্ধ রয়েছে।
নতুন পারিবারিক আইন নিয়েও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, এই ধরনের আইন নারীর স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে সীমিত করতে পারে।
তবে ইসলামি আইনজ্ঞদের একাংশ বলছেন, ইসলামে জোরপূর্বক বিয়ে সম্পূর্ণ হারাম। কুমারী নারীর লজ্জাশীলতার বিষয়টি বিবেচনা করেই শরীয়তে তার নীরবতাকে সম্মতির প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
এনআর/
