ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ, বিচারিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখতে ১৯৯১ সালের উপাসনালয় সুরক্ষা আইন (প্লেস অব ওয়ারশিপ অ্যাক্ট) কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনবিদ, সাবেক বিচারপতি ও বুদ্ধিজীবীরা। নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় আয়োজিত “ধর্মনিরপেক্ষতা, বিচারিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি” শীর্ষক এক বিশেষ সাংবিধানিক আলোচনা সভায় এই দাবি জানানো হয়।
জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘জাস্টিস অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট অব মাইনরিটিজ’ এবং ‘সাউথ এশিয়ান মাইনরিটিজ লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (সামলা)-র যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের ওপর একটি গবেষণামূলক প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা মাহমুদ মাদানি। প্রকাশিত প্রতিবেদনটিকে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই গবেষণাটি বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের ওপর একটি বিকল্প সাংবিধানিক ও একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। রায়ের কোথাও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি যে কোনো মন্দির ভেঙে বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল।”
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ৭৮৮ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে তিনি জানান, আদালত নিজেই স্বীকার করেছে যে এই দাবির পক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কাশী, মথুরা ও কামাল মওলা মসজিদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থান নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া বিতর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মাওলানা মাদানি বলেন, এটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সমস্যা নয়, বরং ভারতের সাংবিধানিক পরিচয় ও বিচার ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্ন। একই সাথে সংখ্যালঘু অধিকার ক্ষুণ্ণকারী শক্তির পাশে না দাঁড়াতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটি অব দিল্লির উপাচার্য ও বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ফয়জান মুস্তাফা ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর ঐতিহাসিক রেকর্ড এবং আইনি নথি সংরক্ষণের ওপর বিশেষ জোর দেন।
প্রবীণ আইনজীবী সালমান খুরশিদ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সূত্র ধরে বলেন, এই রায়ের একটি বড় অংশ মুসলিম পক্ষের আইনি দাবিগুলোকে স্বীকৃতি দেয়। এমনকি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের (এএসআই) প্রতিবেদনগুলোও কোনো মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মাণের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে না।
অন্যদিকে, পাটনা হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি ইকবাল আহমেদ আনসারি এই প্রতিবেদনটিকে আইনি ও সামাজিক বাস্তবতার একটি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ বলে অভিহিত করেন। তিনি মন্তব্য করেন, বাবরি মামলায় যা শোনানো হয়েছে তা কোনো পূর্ণাঙ্গ বা যুক্তিভিত্তিক বিচারিক রায় ছিল না, বরং তা ছিল কেবল একটি আদেশ মাত্র।
সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং জোর দিয়ে বলেন, বাবরি মসজিদের রায় বা উপাসনালয় সুরক্ষা আইন কেবল কোনো ধর্মীয় বিরোধের বিষয় নয়, এটি ভারতের সাংবিধানিক ভবিষ্যতের সাথে জড়িত। যেকোনো ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আদালতের রায় ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়, বরং সংবিধান, সমতা ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
অ্যাডভোকেট এম আর শামশাদ সতর্ক করে বলেন, ১৯৯১ সালের আইনটিকে দুর্বল করার বা প্রত্নতাত্ত্বিক আইনকে ব্যবহার করে নতুন বিতর্ক তৈরি করার চেষ্টা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও সাংবিধানিক কাঠামোর জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
অনুবাদ: তানবিরুল হক আবিদ
টিএইচএ/
