মেহমানদারি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। এটি কেবল খাবার পরিবেশন নয়, বরং মানবিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার এক উৎকৃষ্ট বাহন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল মেহমানদারির অনন্য আদর্শ। তিনি অমুসলিমদেরকেও নিজ দস্তরখানায় জায়গা দিতেন, বাড়ির সবচেয়ে ভালো খাবার মেহমানকে আগে পরিবেশন করতেন এবং তিন দিন পর্যন্ত মেহমানের ইজ্জত-আদর করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন।
একথা ঠিক যে, কওমি মাদরাসাগুলো জ্ঞান-চর্চা ও ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র। কিন্তু এসব কেন্দ্রের চারপাশে আবর্তিত হয় হাজার হাজার মানুষ—ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক, আলেম, দাওয়াতি কর্মী, সাধারণ মুসল্লি এবং দেশি-বিদেশি মেহমান। এদের সবার জন্য উপযুক্ত মেহমানখানা ও মেহমানদারির ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
বাস্তব অভিজ্ঞতা: যেসব মাদরাসায় মেহমানদারি দৃষ্টান্তমূলক
আমি নিজে দেশের বিভিন্ন কওমি মাদরাসায় মেহমান হয়েছি। কিছু জায়গার আয়োজন সত্যিই প্রশংসার দাবিদার:
বগুড়ার জামিল মাদরাসা: দক্ষিণ দিকের দোতলায় বিশাল মেহমানখানা। রাত দশটায় এসেও আমরা পেলাম চিকন চালের ভাত, পোলাও, রুটি, মাছ, মুরগি আর বিখ্যাত বগুড়ার দই। শায়খ নিজামী (রহ.)-এর ছেলে মাওলানা আতাউল্লাহ ভাই নিঃস্বার্থ মেহমানদারির আদর্শ রেখেছিলেন।
দারুল উলুম নিজামিয়া মোমেনশাহী: মেহমানখানা অনুপম। সুন্নাহ মোতাবেক যথাযথ মেহমানদারি করা হয়।
জামিয়া আরাবিয়া মাখজানুল উলূম, ময়মনসিংহ: এসি সমৃদ্ধ, মনকাড়া আয়োজন। পটিয়া মাদরাসা: মেহমানখানার নকশা ও ব্যবস্থাপনা অনুসরণযোগ্য।
ঢাকা বসুন্ধরা মাদরাসা: মেহমানদারির বিরল আয়োজন দেখেছি—ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও আতিথেয়তার মান অসাধারণ।
দেওবন্দ (ভারত): তিন দিনের আয়োজন। দস্তরখানে রুটি, গোশত, ভাত ও পোলাও। কোনো মেহমান অভুক্ত ফেরে না।
আরও অনেক মাদরাসায় পৃথক মেহমানখানা আছে। এসব প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করেছে, মেহমানদারি সম্ভব ও বরকতময়।
বিপরীত চিত্র: যেখানে মেহমানদারীতে ঘাটতি রয়েছে
দুঃখের বিষয়, অনেক মাদরাসাতেই এখনো মেহমানদারি উপেক্ষিত। কিছু জায়গায়—
· মেহমানখানার নামে একটু খারাপ ঘর বা পরিত্যক্ত বারান্দা,
· নেই বিছানা, নেই বালিশ, নেই পাখা বা এসি,
· টয়লেট অপরিষ্কার, পানির ব্যবস্থা নেই,
· রাতে এলে পর্যন্ত খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই,
· মেহমানকে বোঝা মনে করা হয়, সম্মান দেওয়া হয় না।
এমন মাদরাসাগুলো কওমের দাবি করলেও কওমের মানুষ মেহমান হতে দ্বিধা বোধ করেন। নানা অব্যবস্থাপনা মেহমানদারী বিষয়ে।
প্রস্তাবনা : কী করা উচিত?
* মেহমানখানা নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা
যেকোনো বহুতল ভবন নির্মাণের সময় নকশায় মেহমানখানা রাখা আবশ্যক করা হোক। এটি হতে পারে স্বতন্ত্র একটি ফ্লোর বা নির্দিষ্ট কয়েকটি কক্ষ।
* তিন দিনের সুন্নাহ পালন
রাসুল (সা.) বলেছেন, “মেহমানের মেহমানদারি তিন দিন। এর বেশি তাকে খাওয়ানো সাদকা।” তাই ন্যূনতম তিন দিনের ব্যবস্থা থাকা চাই।
* “মেহমান ফান্ড” গঠন
মাসিক বা বার্ষিক বাজেটে “মেহমান ফান্ড” রাখা হোক। অভিভাবক, ছাত্র ও দাতারা এতে অংশ নিতে পারেন। অনেক জায়গায় সফলভাবে চালু আছে।
* আলেম-আলেমের সেতুবন্ধ
আলেম আলেমকে, মাদরাসাওয়ালা মাদরাসাওয়ালাকে ইকরামসহ মেহমানদারি করলে ভালোবাসার বন্ধন মজবুত হবে। এতে বিভক্তি কমবে, সহযোগিতা বাড়বে।
* অমুসলিম মেহমানদের জন্যও ব্যবস্থা
নবীজির দস্তরখানায় অমুসলিমরাও মেহমান হতো। আমাদের মাদরাসাগুলোতে দাওয়াতি কাজের অংশ হিসেবে অমুসলিম মেহমানদের জন্যও মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন থাকা উচিত।
* খাদেম- পরিচর্যাকারী নিয়োগ
মেহমানখানার জন্য একজন দক্ষ খাদেম বা কর্মচারী নিয়োগ করা হোক। তিনিই দেখবেন পরিচ্ছন্নতা, খাবারের সময়, বিছানার ব্যবস্থা ইত্যাদি।
মেহমানদারি দামি আসবাব বা বিলাসিতার নাম নয়—বরং এটি ইজ্জত দেওয়ার নাম, সুন্নাহ আদায়ের নাম, ভালোবাসার নাম। কওমি মাদরাসাগুলো ইসলামের দুর্গ। এই দুর্গের দ্বার যদি মেহমানদের জন্য সর্বদা খোলা না থাকে, তবে সেই দুর্গ কিছুদিনের মধ্যেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।
আমরা চাই, প্রতিটি কওমি মাদরাসায় হোক মেহমানখানা, চালু হোক নবীজির সুন্নাহ। তাহলেই কওমের সঙ্গে মাদরাসার সম্পর্ক হবে প্রাণের, হবে স্থায়ী।
লেখক : পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট
