কওমি মাদরাসায় গবেষণা ও বিদেশযাত্রা

​লাবীব আব্দুল্লাহ

by Masudul Kadir

​আমাদের মাদরাসাগুলোতে দৃশ্যমান বড় বড় ইমারত ও বহুতল ভবন নির্মাণ না করে, তালেবে ইলমদের (শিক্ষার্থীদের) প্রকৃত মেধা বিকাশ ও পড়াশোনার গুণগত মানোন্নয়নে আরও মনোযোগী হওয়া এখন সময়ের দাবি।

​১. গবেষণা খাতে বিনিয়োগের অভাব

বিজ্ঞাপন
banner

​কওমি মাদরাসাগুলোতে সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাপত্র (Research Paper) লেখা ও প্রকাশের চর্চা নেই বললেই চলে; যা-ও বা হয়, তা উল্লেখ করার মতো নয়। বর্তমান যুগের বড় দাবি হলো, গবেষণার পেছনে সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করা। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আরও দূরদর্শী ভূমিকা পালন করতে পারেন।

​কওমি মাদরাসায় হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছেন—যেমন, যারা আল-কুরআনের হাফেজ, তারা নিঃসন্দেহে প্রখর মেধার অধিকারী। তাদের এই মেধা বিকাশের সঠিক সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করে দিলে, তারা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের কুরআনিক গবেষক হতে পারবেন।

​২. প্রায়োগিক আরবি (Applied Arabic) ও ভাষাগত দুর্বলতা

​আমাদের মাদরাসাগুলোতে ‘নাহব’ ও ‘সরফ’ (আরবি ব্যাকরণ) অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়ানো হয়; কিন্তু ফলিত বা প্রায়োগিক আরবির (Applied Arabic) চর্চা না থাকায় আমরা ভাষার মূল চারটি দক্ষতা (Listening, Speaking, Reading, Writing) থেকে অনেক পিছিয়ে আছি।

​আমরা অনেকেই আরবিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে লিখতে বা বলতে পারি না। দৈনন্দিন কথোপকথনে “কাইফা হালুকা” (কেমন আছেন) বা “আইনা বাইতুকা” (আপনার বাড়ি কোথায়)—এ জাতীয় গণ্ডিবদ্ধ কিছু বাক্য ছাড়া মনের ভাব সাবলীলভাবে প্রকাশ করার যোগ্যতা আমাদের গড়ে ওঠে না।

​কওমি মাদরাসা থেকে মাঝেসাঝে আরবি দেয়ালিকা, পত্রিকা বা ম্যাগাজিন (মাজাল্লাহ) প্রকাশিত হলেও আর্থিক সংকটের কারণে তা স্থায়িত্ব পায় না। তালেবে ইলমরাও এসব পত্রিকা কিনে পড়ার আর্থিক সামর্থ্য বা আগ্রহ দেখায় না; ফলে কিছুদিন পরই পত্রিকাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া হাজার হাজার মাদরাসায় আরবি পড়ানো হলেও, মানসম্মত আরবি লেখকের বড্ড অভাব। হাজার বছর ধরে আরবি পড়েও আমরা কেন আরবীতে এতটা দুর্বল, এটি আজ গভীর এক গবেষণার বিষয়।

​৩. উচ্চশিক্ষা ও বিদেশ যাত্রার সংকট

​আমাদের কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলো শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করে না। অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে কোনো কার্যকর শিক্ষা বিনিময় বা ক্রেডিট ট্রান্সফার (Muadalah) ব্যবস্থা নেই। কোনো কোনো মাদরাসার ব্যক্তিগত উদ্যোগে পূর্বে ‘মুআদালা’ বা স্বীকৃতি থাকলেও, বর্তমানে যোগাযোগের অভাব বা প্রশাসনিক জটিলতায় তা বন্ধ হয়ে পড়েছে।

​ফলশ্রুতিতে, আমাদের সন্তানেরা উচ্চশিক্ষার জন্য মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, আল-আজহার বা বিশ্বের অন্যান্য নামকরা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখলেও তা বাস্তবে রূপ দিতে পারছে না। অথচ আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীরা সহজেই দাখিল-আলিম শেষ করে এসব আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করছে।

​কওমি মাদরাসায় দ্বীনি ও ইসলামিক বিষয়গুলো আরও গভীর এবং বিস্তারিতভাবে পড়ানো সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এটি মাদরাসা কর্তৃপক্ষের এক প্রকার উদাসীনতা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্যময় কারণ রয়েছে—তা খতিয়ে দেখা দরকার।

​আমাদের প্রত্যাশা

​আমরা আশা করি, আমাদের কওমি মাদরাসার অভিভাবক ও নীতি-নির্ধারকেরা দ্রুত সজাগ হবেন। তারা আমাদের তালেবে ইলমদের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করবেন। অথবা দেশের মাটিতেই গবেষণামূলক পড়াশোনার এমন আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশ তৈরি করবেন, যেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জনের জন্য আমাদের মাদরাসাগুলোতে ছুটে আসে।

​এটি আজ হয়তো একটি স্বপ্ন বা চিন্তা, তবে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোনো এক সময় তা বাস্তবে রূপ নেবে, ইনশাআল্লাহ।

লেখক : ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222