দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈঠকে আলোচনার সার সংক্ষেপ

by Masudul Kadir

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: কী বিষয়ে দোহায় কথা বললেন বিশ্ব নেতারা। কাতারের দোহায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের প্রথম দফার পরোক্ষ কারিগরি আলোচনা। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকা এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের হুমকিমূলক বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে তেহরান। আর দুই পক্ষ চুক্তি লঙ্ঘনের ঘটনা তদারকিতে একটি ‘দ্রুত যোগাযোগ মাধ্যম’ চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে।

ইরান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি চালুর লক্ষ্যে কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের পরোক্ষ কারিগরি আলোচনা হয়েছে। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তিন দেশের ঊর্ধ্বতন আলোচকদের উপস্থিতিতে হয় এই বৈঠক।

বিজ্ঞাপন
banner

বৈঠকে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তোলে তেহরান। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে মার্কিন সেনা মোতায়েন, সামরিক সরঞ্জাম বাড়ানো এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক কিছু হুমকিমূলক ও হস্তক্ষেপমূলক বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় ইরানি প্রতিনিধি দল।

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার কারণে সেসব ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হবে না বলে আবারও স্পষ্ট করেছে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদী সতর্ক করে বলেছেন, সমঝোতা স্মারকের একটি শর্ত লঙ্ঘন হলে পুরো চুক্তিই ভেস্তে যেতে পারে। এই সমঝোতা স্মারকের যেকোনো ধরনের লঙ্ঘন ও ত্রুটি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিবদ্ধ করতে এবং তা দ্রুত তদারকিতে শিগগিরই একটি বিশেষ যোগাযোগ মাধ্যম চালু করা হবে।

এ ছাড়া ইরানের জব্দকৃত অর্থের একটি অংশ তেহরানের প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার কাজে ব্যবহারের বিষয়েও বৈঠকে অগ্রগতি হয়েছে।

আলোচনার বিষয়ে অবগত সূত্রগুলো জানায়, দুই দেশের প্রতিনিধিরা দোহায় দুই দিন ধরে বৈঠক করেছেন। তারা মূলত প্রাথমিক চুক্তির দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও ইরানের আটকে থাকা তহবিল ছাড় করানো নিয়ে আলোচনা করেন।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা–দাফনের পর পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ৯ জুলাই তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, গত জুনে যে সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ হয়েছিল, দোহা আলোচনায় সে বিষয়ে ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হয়েছে। সুইজারল্যান্ড শীর্ষ সম্মেলনের ‘ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই’ এ আলোচনা এগিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে দুই পক্ষই এগিয়ে যাচ্ছে। মূলত এই পরমাণু কর্মসূচির কারণেই গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন তিনি।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার কাজ ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। এখন দেখা যাক কী হয়।’

তবে সূত্রগুলোর দাবি, এবারের আলোচনায় পরমাণু কর্মসূচির বিষয়টি ওঠেইনি। আলোচনা মূলত কারিগরি বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, পরমাণু ইস্যুটি পরে বিবেচনা করা হবে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘পরমাণু ইস্যু নিয়ে আমরা অবশ্যই চিন্তিত। আমরা এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছি।’

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা আলাদা বৈঠক করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানান, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও শীর্ষ মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এ বৈঠকে অংশ নেননি। অথচ একে ‘উচ্চপর্যায়ের’ আলোচনা আখ্যা দিয়ে হোয়াইট হাউস তাদের ওই অঞ্চলে পাঠিয়েছিল।

ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতা ও উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, আলোচনা শেষ হয়েছে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো মতবিরোধ দূর হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কেউ কিছু জানায়নি।

প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচলের সুযোগ দিতে হবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে। যুদ্ধের আগে বিশ্বব্যাপী তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ এই পথেই হয়।

যদিও এ পথে আংশিকভাবে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে, কিন্তু এই কৌশলগত পানিপথের নিয়ন্ত্রণ এখন কার হাতে, তা এখনও অস্পষ্ট। একটি মালবাহী জাহাজে ইরানের হামলার পর গত সপ্তাহান্তে দুই দেশ একে অপরের ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

ইরানের দুজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেছেন, প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে ইরান বদ্ধপরিকর। প্রয়োজনে তারা শক্তিও প্রয়োগ করবে। ইরান বারবার বলেছে, আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে তারা জাহাজ চলাচলের ওপর মাশুল (টোল) আরোপ করবে। কারণ, ওই সময় প্রাথমিক চুক্তিতে উল্লেখিত মাশুলমুক্ত সময়সীমা শেষ হয়ে যাবে।

বুধবার ট্রাম্পের মন্তব্যে ইরানের সঙ্গে পুনরায় সর্বাত্মক যুদ্ধ বেধে যাওয়ার শঙ্কা কিছুটা কমেছে। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, তারা অনেক দূর এগিয়েছে।’

ট্রাম্পের এ মন্তব্যের পর তেলের দাম গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম বিশ্লেষকেরা তেলের দাম কমার পূর্বাভাস দিলেন।

বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানি কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত রুটের বাইরে একটি বিদেশি কনটেইনার জাহাজ অগভীর পানিতে আটকে গেছে।

তেলবাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভান্ডা ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে শুরু করেছে। তবে এটি এখনও অসম্পূর্ণ ও অনিশ্চিত। সার্বিক পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।’

ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ এই প্রণালি থেকে মাইন অপসারণে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস বলেছেন, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের অসহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের কারণে তার দেশ এ উদ্যোগে অংশ নেবে বলে তিনি মনে করেন না।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222