নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সেমিনার নিয়ে বিতর্ক: সমতা কি ন্যায় আনে, নাকি ইনসাফ?

by hsnalmahmud@gmail.com

হাসান আল মাহমুদ >>

রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ২৩ আগস্ট শনিবার অনুষ্ঠিত হলো নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা বিষয়ক এক সেমিনার। ইনসাফ ফাউন্ডেশনের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এ সেমিনারের প্রতিপাদ্য ছিল— ‘মোহরানা স্ত্রীর প্রতি অনুগ্রহ নয় বরং অধিকার’ এবং ‘আপনার কন্যাকে সুশিক্ষা দিচ্ছেন কি?’ ইত্যাদি।

বিজ্ঞাপন
banner

সেমিনারে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব দেশবরেণ্য আলেম মুফতি মাওলানা আব্দুল মালেকসহ বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, আলেম ও সমাজ বিশ্লেষকরা বক্তব্য রাখেন।

আলেম ও শিক্ষাবিদদের বক্তব্য

সেমিনারের প্রধান অতিথি মাওলানা আব্দুল মালেক বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে জড়ানো তাদের ভবিষ্যতের প্রতি জুলুম। কলেজ-ভার্সিটির ছাত্রদের বিভিন্ন দলে টেনে নেওয়া হয়, ফলে তাদের শিক্ষা ও কর্মজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলামপন্থী দলগুলোকেও এ ভুল থেকে বের হতে হবে।’

তিনি আরও আহ্বান জানান, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার।

ইনসাফ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক শায়খুল হাদীস মাওলানা আবুল বাশার বলেন, ‘আজ কন্যাদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়, মায়ের অধিকারও অবহেলিত হয়। সহোদর ভাইয়েরা বোনের প্রাপ্য সম্পত্তি কেড়ে নেয়। নারী নির্যাতনের এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের পথ হলো ইসলামী শিক্ষা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া।’

কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. এবিএম হিজবুল্লাহ বলেন, ‘বিবাহ নিরুৎসাহিত করার এক প্রবণতা এখন সমাজে ছড়াচ্ছে। তালাক, পরকীয়া ইত্যাদি বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি বিবাহের আগে পাত্র-পাত্রীদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন।’

অন্যরকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান সোহাগ বলেন, ‘নারীবাদ নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়েছে। এতে সমাজে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং নারীর ওপর নির্যাতন বাড়ছে।’

পুলিশের এডিআইজি (অব.) নাজিবুর রহমান বলেন, ‘ন্যায় প্রতিষ্ঠায় প্রশাসন ও বিচার বিভাগের বড় ভূমিকা রয়েছে। তাই এ খাতে উদ্যোগ বাড়ানো দরকার।’

বুয়েটের অধ্যাপক ড. লুতফুল কবীর মনে করিয়ে দেন, ‘শুধু সচেতনতা নয়, বরং বিপদ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা জরুরি। এজন্য দম্পতিদের কাউন্সেলিং ইনসাফ ফাউন্ডেশনের কর্মসূচিতে যুক্ত করা উচিত।’

সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া

সেমিনারটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। বিশেষ করে সেক্যুলার ও বাম ধারার কিছু মহল এ আয়োজন নিয়ে কটাক্ষ করে।

তবে মুহাম্মাদ সাব্বির নামে একজন ফেসবুকে লেখেন, ‘আমি প্রোগ্রামটি সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। সেক্যুলারদের কান্নাকাটি দেখে খোঁজ নিলাম, তারপর ভিডিওগুলো দেখে ভালো লাগলো। পারিবারিক গ্রুপে শেয়ার করার পর সবাই প্রশংসা করেছে।’

যায়েদ মুহাম্মদ মন্তব্য করেন, ‘সেক্যুলারদের চিতকার-চেঁচামেচিতে হতাশ হওয়ার কিছু নাই। ইনসাফ ফাউন্ডেশনের এই আয়োজন যতটা ফোকাস আর গুরুত্ব পাওয়ার কথা, ততটা আসলে পায় নি। সেক্যুলাররা একটু মজা নিতে গিয়ে মোটামুটি ইনসাফের উদ্যোগের ব্যাপারে সবাইকে আগ্রহী করে তুলেছে। ট্রলের এই তীর আসলে কাজে লাগে নাই। উল্টা ভাল ভাল কিছু আলাপ-আলোচনা উঠে আসছে। ইনসাফের আয়োজনেরও অনেক অনেক দিক সবাই জানতে পেরেছে। দিনশেষে এটাই ত দরকার ছিল।’

সমতা নয়, ইনসাফই প্রকৃত ন্যায় একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

আধুনিক সমাজে সমতার দাবি একটি বহুল প্রচলিত বিষয়। বিশেষ করে নারীবাদী আন্দোলন, মানবাধিকার সংগঠন কিংবা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণায় সমতাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন সমতাই সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এবং ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, কেবল সমতা (Equality) কখনোই যথেষ্ট নয়। বরং প্রকৃত প্রয়োজন ইনসাফ (Justice), যা প্রতিটি মানুষকে তার অবস্থান, ক্ষমতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রাপ্য অধিকার দেয়।

সমতা অনেক সময় কৃত্রিম হয়—যেখানে সবাইকে একই ছাঁচে ফেলার চেষ্টা করা হয়। পক্ষান্তরে, ইনসাফ হলো প্রাকৃতিক—যেখানে প্রতিটি মানুষকে তার প্রকৃত অবস্থান অনুযায়ী সুযোগ দেওয়া হয়। এই পার্থক্য বোঝাতে কিছু উদাহরণ নিচে উপস্থাপন করা হলো।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সমতা ও ইনসাফের মাঝে পার্থক্য নিয়ে একটি চিত্র।

সমতা বনাম ইনসাফ: বাস্তব উদাহরণ

১. নারী ও পুরুষের সক্ষমতা
একজন পুরুষ ও একজন নারীকে সমান ভার বহন করতে দেওয়া সমতা। কিন্তু নারীর শারীরিক গঠন দুর্বল হলে সেই ভার তার জন্য অন্যায়ের শামিল হয়। এখানে ইনসাফ হলো—যার সক্ষমতা কম, তার বোঝা হালকা করে দেওয়া।

২. শিশুদের জামার মাপ
দুই শিশুর একজন লম্বা, আরেকজন খাটো। উভয়ের জন্য একই মাপের জামা বানানো সমতা হলেও তা ব্যবহারিক নয়। লম্বা শিশুর জামা ছোট হয়ে যাবে, খাটো শিশুর জামা হবে অতিরিক্ত বড়। তাই প্রত্যেককে তার শরীর অনুযায়ী জামা বানানো ইনসাফ।

৩. মানবিক যোগ্যতার পার্থক্য
কেউ ইনডোর কাজের জন্য উপযুক্ত—গবেষণা, বই পড়া, চিন্তাভাবনা, সফটওয়্যার ডিজাইন ইত্যাদিতে দক্ষ। অন্যজন আউটডোর কাজের জন্য উপযুক্ত—মাঠপর্যায়ে কাজ করা, নেতৃত্ব দেওয়া, প্রচারণা চালানোতে স্বাভাবিক পারদর্শিতা। এই দুইজনকে একই পরিবেশে প্রতিযোগিতায় নামানো সমতা হলেও তা বাস্তবে অন্যায়। প্রকৃত ইনসাফ হলো—যার যে যোগ্যতা, তাকে সেই পরিবেশে সুযোগ দেওয়া।

৪. হাসপাতালের সেবা
সব রোগীকে সমান গুরুত্ব দেওয়া সমতা। কিন্তু এতে গুরুতর রোগীরা উপযুক্ত চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়বে। বরং ক্রিটিকাল রোগীদের আগে চিকিৎসা দেওয়া এবং হালকা অসুস্থদের পরে চিকিৎসা দেওয়া ইনসাফ।

সমতার সীমাবদ্ধতা

সমতা শুনতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে এটি প্রায়ই বৈষম্য তৈরি করে। কারণ—

  • প্রথমত, সবাইকে একই জায়গায় দাঁড় করানো মানেই ন্যায় নয়; বরং অনেকের জন্য তা অন্যায়ের কারণ হয়।
  • দ্বিতীয়ত, মানুষের যোগ্যতা, পরিস্থিতি ও প্রয়োজন এক নয়। সমতা সেই বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে।
  • তৃতীয়ত, সমতা প্রতিযোগিতা তৈরি করে, সহযোগিতা নয়।

নারীবাদী আন্দোলনের ভুল দাবি

নারীবাদীরা প্রায়ই বলে থাকে—“নারীকে পুরুষের সমান করতে হবে।” অথচ ইসলাম নারীর সম্মান দিয়েছে সমান করে নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা ও দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে। নারী মাতৃত্বের গৌরব লাভ করেছে, পুরুষ দায়িত্ব পেয়েছে পরিবারকে রক্ষা ও ভরণপোষণ করার।

নারীবাদীরা সহযোগিতা চায় না, চায় প্রতিযোগিতা। তাদের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ একই কাজ, একই দায়িত্ব ও একই ভূমিকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। কিন্তু এতে প্রকৃতপক্ষে নারীর প্রতি অবিচারই হয়। কারণ নারী-পুরুষের শারীরিক, মানসিক, জৈবিক ও সামাজিক গঠন ভিন্ন। সমতা চাপিয়ে দিলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয় না, বরং বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে ইনসাফ

ইসলাম সবসময় ইনসাফের উপর গুরুত্ব দিয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ”
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন—অমানত যথাযথভাবে তাদের কাছে পৌঁছে দিতে এবং মানুষের মাঝে বিচার করলে ন্যায়বিচার করতে।” (সূরা আন-নিসা ৪:৫৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘সাবধান! অত্যাচার কেয়ামতের দিনে অন্ধকার হয়ে দাঁড়াবে।’  (সহিহ মুসলিম)

অতএব, ইসলামে সমতার চেয়ে বড় মূল্যবোধ হলো ইনসাফ—ন্যায়বিচার।

আধুনিক সমাজে ইনসাফের প্রয়োজনীয়তা

আজকের পৃথিবী সমতার নামে এক ধরনের ভ্রান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে সবাইকে একইভাবে বিচার করা হয়, অথচ কারও শেখার ক্ষমতা কম, কারও বেশি। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ভিন্ন প্রকৃতি স্বীকার না করে একই দায়িত্ব চাপানো হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রয়োজনকে একই মাপে মাপতে গিয়ে অনেকে বঞ্চিত হয়। এসব ক্ষেত্রেই প্রকৃত সমাধান হলো ইনসাফ—প্রত্যেককে তার অবস্থান অনুযায়ী ন্যায্য অধিকার দেওয়া।

গবেষকদের মতে,  সমতা সবসময় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না। বরং অনেক সময় সমতা অন্যায়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃত ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ইনসাফ—যা প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করে। ইসলাম এই ইনসাফকেই সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাই আমাদের মূল দাবি হওয়া উচিত—সমতা নয়, বরং ইনসাফ।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222