149
আফগানিস্তান—যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, দীর্ঘ দুই দশক বিদেশি দখলদারিত্ব আর গৃহযুদ্ধের বিভীষিকা পেরিয়ে নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। তালেবান নেতৃত্বাধীন ইমারাতে ইসলামিয়া চার বছর পূর্ণ করেছে। সমালোচনা, প্রচার আর ভুল বোঝাবুঝির ভেতর দিয়েও তালেবান সরকার বলছে—তারা দেশের নারী সমাজের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উদ্যোগ নিয়েছে।
কাবুলের পশ্চিমে ‘কালা’ বা দুর্গ নামে পরিচিত মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন করেছে। সেখানে শতাধিক নারী আশ্রিত থাকলেও তালেবান সরকার বলছে, এটি সমাজের এক বিশেষ সমস্যার প্রতিফলন। যুদ্ধ ও বিদেশি দখলদারিত্বের সময় নারী সমাজ যে মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল, আজও তার প্রতিধ্বনি রয়ে গেছে। তবে সরকার আশ্বাস দিচ্ছে—নারীদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে ইসলামী শরিয়াহর আলোকে।
নারী শিক্ষার প্রসার
সম্প্রতি আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাওলানা আমীর খান মুত্তাকী জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি, এর মধ্যে ২৮ লাখ নারী শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে। শত শত নতুন বিদ্যালয় ও মাদরাসা নির্মাণ করা হয়েছে। যদিও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তালেবান নেতৃত্ব স্পষ্ট বলছে—“ইসলামী সমাজব্যবস্থার সীমারেখার ভেতরে থেকেই নারীদের শিক্ষা কার্যক্রম চলবে।” এটি নিঃসন্দেহে নারী শিক্ষার জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
নারীদের কর্মসংস্থান ও মর্যাদা
সরকারি চাকরিতে নারীদের বিষয়ে তালেবান সরকারের নীতি আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তালেবান সরকার বলছে, নারীদের ঘরের ভেতরে থাকার সুযোগ দিয়ে তাদের মর্যাদা রক্ষা করা হচ্ছে। অনেক নারীকে সরাসরি কাজে অংশগ্রহণ করতে না হলেও সরকার তাদের ঘরে বসেই নিয়মিত বেতন প্রদান করছে। এর ফলে তারা আর্থিকভাবে পরিবারকে সহায়তা করতে পারছেন, একই সঙ্গে সামাজিক ও ধর্মীয় শালীনতাও বজায় থাকছে। তালেবান নেতৃত্বের মতে, এটি নারী মর্যাদা রক্ষার এক অনন্য পদক্ষেপ।
নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা
নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে তালেবান কঠোর অবস্থানে। অতীতে আফগান নারীরা দখলদার শক্তির হাতে নির্যাতিত ও অপমানিত হয়েছেন। তালেবান সরকারের দাবি, বর্তমানে দেশের প্রতিটি নারী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাচ্ছে। কাবুলসহ প্রধান শহরগুলোতে অপরাধ ও সন্ত্রাস কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মহল যেখানে নারী স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তালেবান সাফ জানাচ্ছে—“ইসলামের বিধানের বাইরে কোনো স্বাধীনতা প্রকৃত স্বাধীনতা নয়।”
প্রবাসী আফগানদের আহ্বান
সরকার মনে করে, আফগানিস্তান আজ আগের চেয়ে স্থিতিশীল। অর্থনীতি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ রাজস্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই প্রবাসী আফগানদের দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে নারী সমাজের জন্য নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও ধর্মনিষ্ঠ পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে বলে সরকার জোর দিচ্ছে।
সমালোচনা বনাম বাস্তবতা
বহির্বিশ্বে প্রচারিত অনেক সংবাদে বলা হয়, তালেবান আমলে নারী অধিকার সংকুচিত। তবে তালেবান নেতারা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে ইসলামী শরিয়াহর ভেতর দিয়েই নারীর সম্মান নিশ্চিত করা হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্ব যে ‘স্বাধীনতা’ সংজ্ঞা দেয়, তা আফগান সমাজের সংস্কৃতি, ধর্ম ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যায় না। কিন্তু তালেবানের মডেল—মর্যাদা, নিরাপত্তা ও শিক্ষা—সবই ইসলামসম্মত কাঠামোয় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আফগান নারীদের নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রচুর সমালোচনা থাকলেও তালেবান সরকার নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে—তারা নারী সমাজকে অরক্ষিত নয়, বরং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সুযোগ দিচ্ছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বেতনের মাধ্যমে নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তালেবান সরকারের দাবি, যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগান নারী আর ধুঁকে ধুঁকে মরছে না, বরং ইসলামী শরিয়াহর ছায়াতলে মর্যাদা ও নিরাপত্তার ভেতর নতুন জীবনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
এনএ/