গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-বিকেএমের উদ্যোগে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আমীরে মজলিস মাওলানা মামুনুল হক এর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম, বিকেএমের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, নায়েবে আমির মাওলানা রেজাউল করিম জালালী, শায়খুল হাদীস মাওলানা আলী উসমান, মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমাদ, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হুসাইন, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ময়মনসিংহ-২ এর সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদুল্লাহ, মাদারিপুর-১ এর সংসদ সদস্য মাওলানা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা, এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী, ডাকসু ভিপি আবু সাদেক কায়েম, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের, বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের সভাপতি মাওলানা জাহিদুজ্জামান ও বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের সভাপতি মুহাম্মাদ আব্দুল আজিজ।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জুলাইয়ের অঙ্গীকার ছিল—আগামীর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে ১৯৪৭ সাল, ২০১৩ সাল এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক বিজয়ের ভিত্তির ওপর। আজ যারা মনে করেন, কেন বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ও ইসলামপন্থীরা জুলাই বিপ্লবের পক্ষে কাফনের কাপড় বেঁধে রাজপথে নামতে চায়—আমি তাদের বলতে চাই, আমরা জুলাই বিপ্লবকে এজন্যই বাস্তবায়ন করতে চাই। কারণ, এই জুলাই বিপ্লব ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গের চেতনাকে ধারণ করে, ১৯২১ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটকে ধারণ করে, ১৯৪৭ সালের স্বাধীন জাতিসত্তাকে ধারণ করে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে, ২০১৩ সালের শাপলার চেতনাকে ধারণ করে এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে ধারণ করে।
তিনি বলেন, যারা ইসলামকে ভালোবাসে, বাংলাদেশকে ভালোবাসে এবং বাংলাদেশের শতবর্ষের ঐতিহ্যকে ধারণ করে—তারা জুলাই বিপ্লবের বিপক্ষে থাকতে পারে না। আমি আজকের ক্ষমতাসীন বিএনপিকে বলতে চাই, আপনারা বাংলাদেশের ৫০ বছরের রাজনীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না। শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সাথে গাদ্দারি করে বিএনপি টিকে থাকতে পারবে না।

বিএনপি নেতৃত্ব ও নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে আপনারা জন্ম নিয়েছেন, তার সাথে গাদ্দারি করা মানে জন্মদাত্রী মায়ের গর্ভকে অস্বীকার করা। বাংলাদেশে পূর্বে তিনটি গণভোট হয়েছে—কোনো গণভোটের সাথেই কেউ গাদ্দারি করেনি। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের যেখানেই গণভোট হয়েছে, কোনো গণভোটের সাথেই কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। যদি বিএনপি গণভোটের সাথে গাদ্দারি করে, তাহলে বিএনপি বিশ্বের একমাত্র গাদ্দার দল হিসেবে পরিচিত হবে।
বর্তমান সরকারের কুটনৈতিক ব্যর্থতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রেরিত ভরতের নতুন রাষ্ট্রদূতকে পৃথিবীর সকল কূটনৈতিক রেওয়াজ ভঙ্গ করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একজন বিজেপি নেতাকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানো হয়েছে, অথচ এদেশের সরকার টু শব্দটুকু করেনি। বন্ধুরাষ্ট্র ইরান বন্ধুত্বের দায়িত্ব পালন করে তেল দিচ্ছে, কিন্তু আমাদের কূটনীতির ব্যর্থতার কারণে বারবার সেই তেলবাহী জাহাজ আটকে দেওয়া হচ্ছে। আমরা বলতে চাই, আপনারা না পারলে আমাদেরকে দায়িত্ব দিন—আমরা দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলমান নৈরাজ্য সম্পর্কে বলেন, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেভাবে অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে এর দায় একমাত্র সরকারকেই বহন করতে হবে।
আমিরে জামাত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজকে যে মঞ্চে আমরা দাঁড়িয়েছি, এই মঞ্চের সাথে দুটি জিনিস কখনো যাবে না—একটি হলো আধিপত্যবাদ এবং আরেকটি হলো ফ্যাসিবাদ। এই দুইটিকে এই মঞ্চ কখনোই গ্রহণ করবে না, বরদাশতও করবে না। এই মঞ্চে যারা বসে আছেন, তারা জাতির স্বার্থে, দেশপ্রেম ধারণ করার কারণে জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন—আমরা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবো না। আফসোস, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের পর যারা একসময় মজলুম ছিলেন, রাজপথে আন্দোলন করেছেন, সংগ্রাম করেছেন—তাদেরই একটি অংশ আজ সরকারে গিয়ে অতীতের সব কিছু ভুলে গেছেন।
তিনি আরো বলেন, ফ্যাসিবাদীরা বিভিন্ন নেতিবাচক বয়ান তৈরি করে জাতিকে বিভক্ত করেছিল। নির্বাচনের আগে বলেছিলেন—আমরা নির্বাচিত সরকার গঠন করলে সবাইকে নিয়ে দেশ চালাবো। এখন আপনারা কী করছেন?একজনকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন পাকিস্তানে, আরেকজনকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন অন্য দেশে—আর আপনারা এ দেশে রাজত্ব করবেন!
জুলাই আন্দোলনের দুটি স্লোগান ছিল—“দেশ কারো বাপের নয়।” আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে শত শত আলেম-ওলামা জীবন দিয়েছেন এই দেশবাসীকে মুক্তির জন্য। আমরা সেই আলেম-ওলামাদের ত্যাগ বৃথা যেতে দেব না।
তিনি বলেন, যুবক ও শিশুদের কথা দিচ্ছি—আমরা তোমাদের সাথে বেইমানি করবো না। তোমাদের সকল দাবি বাস্তবায়নে আমরা অবিচল থাকবো, ইনশাআল্লাহ। আমাদের বিজয় হবে জনগণের বিজয়।
১২ তারিখের নির্বাচন সম্পর্কে বলেন, তারা সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, এটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার। যদি সত্যিই সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হতো, তবে বারবার তা বলতে হতো না।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর আহ্বায়ক, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা দেখে এসেছি ঐকমত্য কমিশন থেকে সংস্কারের পক্ষে, জুলাই সনদের পক্ষে সর্বদাই কণ্ঠস্বর হিসেবে সবার আগে এসেছেন আল্লামা মামুনুল হক। ষড়যন্ত্র করে তাকে সংসদে যাওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে, কিন্তু রাজপথে তাকে থামানো সম্ভব নয়। আমরা সংসদে আছি, রাজপথে আছেন আল্লামা মামুনুল হক ও নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীরা। যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে সংসদ ও রাজপথ একাকার হয়ে যাবে। আমরা এখন একটু অল্প করে কথা বলছি, কারণ দেশে অনেক সংকট। দেশের মানুষ ভালো নেই। দেশে জ্বালানি সংকট, মানুষের চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। দল থেকে দায়িত্বশীল বক্তব্য দেওয়া হয়েছে—সরকারকে সহযোগিতা করতে চেয়েছি। এই ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রাজনীতি করতে চাইনি, কিন্তু সরকার বারবার কথার বরখেলাপ করছে।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান, কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, আমরা কেন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আপনাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় ডেকে সমগ্র জাতিকে জানাতে চাই—এই সরকার যে কথা দিয়েছিল, সেই কথা তারা মানেনি। ইতিমধ্যে তারা প্রমাণ করেছে যে, প্রত্যেকটি জেলায় জেলা পরিষদে প্রশাসনিক ব্যবস্থা করেছে এবং তাদের দলীয় লোকজনকে দিয়ে পরিচালনা করছে, যা এক ধরনের বাকশালের নমুনা। আমরা কী চেয়েছি? আমরা তো কোনো গাড়ি চাইনি, বাড়ি চাইনি, আশা চাইনি, ব্যাংকের মালিক হতে চাইনি। আমরা চেয়েছি—যারা বিচারপতি হবেন, তারা একটি পরীক্ষার মাধ্যমে বিচারপতি হবেন; তারা কোনো দলীয় ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হবেন না।
মাওলানা জালালুদ্দিন আহমাদ বলেন, সরকার বলে দেশে জ্বালানি সংকট নেই, বিদ্যুৎ সংকট নেই, তেলের সংকট নেই। অথচ আমরা দেখি পেট্রোলের জন্য শত শত গাড়ির লাইন, কয়েক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত গাড়ির সারি। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ নেই বললেই চলে। সবদিকে সংকট, সবদিকে অবনতি। কিন্তু সরকার এগুলোর কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে নিজেদের ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে ব্যস্ত।
লক্ষ্য করছি, এই দেড় মাসে সরকার তাদের পরিবারের কাজ, কৃষক কার্ড দেওয়ার জন্য ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। সরকার যদি এভাবে চলতে থাকে, এই দেশ আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেউলিয়া হয়ে যাবে।
গণসমাবেশ শেষে মাওলানা মামুনুল হক গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবীতে তিন মাস ব্যাপী কর্মসূচি ঘোষনা করেন। ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী মে, জুন ও জুলাই মাসব্যাপী সারাদেশের জেলায় জেলায় নাগরিক সমাবেশের আয়োজন করা হবে। এসব সমাবেশে মাওলানা মামুনুল হকসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অংশ নিবেন। আগামী ৫ আগষ্ট ঢাকায় গণমিছিল করা হবে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন এবং উপস্থিত ছিলেন- যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মাওলানা আব্দুল আজীজ, মুফতি শরাফত হোসাইন, মাওলানা তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজি, মাওলানা শরীফ সাঈদুর রহমান।
সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান হেলাল, মাওলানা ফয়সাল আহমাদ, মাওলানা এনামুল হক মুসা, মাওলানা আবুল হাসানাত জালালী ও মাওলানা আবু সাইদ নোমান এর পরিচালনায় সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা মাহবুবুল হক, মাওলানা কুরবান আলী কাসেমী, সম্পাদক মাওলানা নেয়ামত উল্লাহ, প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাওলানা জহিরুল ইসলাম, বায়তুল মাল সম্পাদক মাওলানা ফজলুর রহমান, প্রকাশনা সাম্পাদক মাওলানা হারুনুর রশদী, সম্পাদক মাওলানা হাসান জুনাইদ, মাওলানা রুহুল আমীন খান, মাওলানা জসিমউদ্দিন, মাওলানা আমজাদ হোসাইন, মাওলানা ছানাউল্লাহ আমিনী, মাওলানা আনোয়ার রাজী, মাওলানা রাকিবুল ইসলাম, মাওলানা মুর্শেদুল আলম সিদ্দিকী প্রমুখ।
হাআমা/
