চাপে ইসলামী আন্দোলন, প্রকাশ্যে এলো আসন সমঝোতার টানাপোড়েন

by hsnalmahmud@gmail.com

হাসান আল মাহমুদ >>

ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহত্তর জোটে আসন বণ্টন নিয়ে টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এসেছে। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির ও প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম জোট শরিক জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ঘোষণাকে ‘অসুন্দর’ বলে মন্তব্য করেন।

বিজ্ঞাপন
banner

তিনি বলেন, বৃহত্তর সমঝোতার স্বার্থে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান যে আসনে নির্বাচন করছেন, সেখানে ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী দেয়নি। তবে নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতে জামায়াতের প্রার্থী দেওয়াকে তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত ও মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

তার ভাষায়, “এই এলাকায় আমাদের সংগঠন ও ভোটব্যাংক রয়েছে। এখানে অন্য শরিকের প্রার্থী দেওয়া হলে তা বাস্তবতার সঙ্গে যায় না।”

মাঠের ক্ষোভের প্রতিফলন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত অসন্তোষ নয়; বরং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। সংশ্লিষ্ট এলাকায় ইসলামী আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটসম্ভাবনার বিষয়টি সামনে আনতেই এই বক্তব্য এসেছে বলে মনে করেন তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শগত মিল থাকলেও নির্বাচনী বাস্তবতায় আসন, প্রভাব ও ভোটব্যাংকের প্রশ্ন উপেক্ষা করা কঠিন। ফলে বিবিসি বাংলার মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই ধরনের মন্তব্য জোট রাজনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বাড়ছে জটিলতা

ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট এক ছাতার নিচে আনতে প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে একসঙ্গে কাজ করছিল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তবে নির্বাচনের ঠিক আগে আসন বণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

শুরুতে আটটি দল এই আলোচনায় ছিল। তবে মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখের একদিন আগে, ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং পরে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) যুক্ত হলে শরিক দলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১টিতে। এতে সমঝোতা আরও জটিল হয়ে ওঠে।

ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতারা অভিযোগ করেন, এই নতুন দলগুলো যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের মতামত যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি এবং জামায়াত একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আসন ভাগাভাগি নিয়ে অসন্তোষ

জোটসংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, জামায়াত নিজের জন্য ১৮০ থেকে ১৮৫টি আসন রাখতে চেয়েছে। বাকি আসন শরিকদের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী ইসলামী আন্দোলন পেত ৪০টি, এনসিপি ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১১টি, খেলাফত মজলিস ৩টি, এবি পার্টি ৩টি, এলডিপি ২টি, জাগপা ৩টি এবং বিডিপি ২টি আসন।

তবে ইসলামী আন্দোলন এই প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নয়। তাদের মতে, সদ্য গঠিত এনসিপিকে ৩০টি আসন দেওয়া অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে খেলাফত মজলিসের অবস্থানও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে মিলেছে।

পাল্টাপাল্টি মনোনয়ন

চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়ন জমার শেষ দিনে জামায়াত ২৭৬টি, ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি, এনসিপি ৪৪টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি এবং খেলাফত মজলিস ৬৮টি আসনে মনোনয়ন দেয়।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, যেসব আসন একে অপরের জন্য ছাড়ার কথা ছিল, সেখানেও উভয় পক্ষ মনোনয়ন দিয়েছে। ফলে জোটের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা কার্যত মাঠে প্রতিফলিত হয়নি।

এখনও সমাধানের আশায় ইসলামী আন্দোলন

তবে উত্তেজনার মধ্যেও ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করছেন না। সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বলেন, “জোট গঠনে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও সদিচ্ছা থাকতে হবে। কেউ বড়, কেউ ছোট—এই মানসিকতা থাকলে একসঙ্গে পথ চলা যায় না।”

অন্যদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “এখানে কোনো সংকট নেই। বিভিন্ন দল ভিন্ন সময়ে যুক্ত হওয়ায় প্রক্রিয়াটি সময় নিচ্ছে মাত্র।”

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

সব মিলিয়ে, ইসলামপন্থী দলগুলোর বৃহত্তর জোটের ভেতরের বাস্তবতা এখন প্রকাশ্য। আদর্শিক ঐক্য থাকা সত্ত্বেও আসন বণ্টন, নেতৃত্বের ভারসাম্য ও মাঠের হিসাব জোটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতা টিকবে, নাকি নির্বাচনের আগে ভেঙে পড়বে — সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222