ফিরে দেখা হেফাজতের ঐতিহাসিক লংমার্চ: যেদিন পাল্টে গিয়েছিল রাজপথ

by hsnalmahmud@gmail.com

আব্দুল্লাহ কাসিম আজওয়াদ >>

আজ ৬ এপ্রিল। বাংলাদেশের ইসলামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে এদিন এক অনন্য ও স্মরণীয় দিন। ২০১৩ সালের এই দিনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ডাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আলেম-ওলামা, কওমি মাদরাসার ছাত্র এবং ধর্মপ্রাণ তৌহিদী জনতা ঢাকামুখী ঐতিহাসিক লংমার্চে অংশ নেন। সেই কর্মসূচি ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়; বরং ইসলাম, কুরআন-সুন্নাহ এবং মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে কটুক্তির বিরুদ্ধে ঈমানি চেতনায় উজ্জীবিত এক বিশাল জনজাগরণ।

বিজ্ঞাপন
banner

সেই সময় দেশে কিছু ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা মহান আল্লাহ, পবিত্র কুরআন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে অবমাননাকর, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ লেখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে থাকে। এসব কর্মকাণ্ড ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হৃদয়ে তীব্র আঘাত হানে। অভিযোগ ছিল, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় জনমনে ক্ষোভ আরও গভীর হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ২০১০ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী দারুল উলুম মাদরাসার মহাপরিচালক, প্রবীণ আলেম ও শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। শুরু থেকেই সংগঠনটি নিজেদের রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং ইসলামের মৌলিক আকিদা ও মূল্যবোধ রক্ষার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত করে তোলে। খুব অল্প সময়েই কওমি অঙ্গনে এই সংগঠন ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে।

২০১৩ সালের শুরুতে শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবির আড়ালে সেখানে সক্রিয় একটি গোষ্ঠী ইসলামি সংস্কৃতি, আলেম সমাজ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে নানা ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য ও স্লোগান দিতে থাকে বলে অভিযোগ ওঠে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে কটুক্তি, আলেমদের বিরুদ্ধে বিদ্রূপ এবং ইসলামি আকিদাবিরোধী প্রচারণা দেশজুড়ে মুসলমানদের মাঝে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়।

এই পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় ১৭ ফেব্রুয়ারি ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে সারাদেশে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। এরপর ১৯ ফেব্রুয়ারি হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী সরকার ও জাতির উদ্দেশে খোলা চিঠির মাধ্যমে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করেন। ওই দাবিগুলোর মধ্যে ছিল ধর্ম অবমাননার বিচার, ইসলামবিদ্বেষী কার্যক্রম বন্ধ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার নানা প্রস্তাব।

পরবর্তীতে ১১ মার্চ হাটহাজারীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে হেফাজত ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করে। সেই কর্মসূচির চূড়ান্ত রূপ নেয় ৬ এপ্রিলের ঢাকামুখী লংমার্চ। কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়। মসজিদ-মাদরাসায় আলোচনা, প্রচারণা এবং জনসংযোগের মাধ্যমে লাখো মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।

৬ এপ্রিলের লংমার্চ ছিল ঈমানি আবেগের এক বিস্ফোরণ। সরকারের পক্ষ থেকে বাধা, নজরদারি এবং প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হলেও জনস্রোত থামানো যায়নি। ঢাকার শাপলা চত্বর ও আশপাশের এলাকা লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, ভ্যান, এমনকি পায়ে হেঁটেও ঢাকার পথে রওনা হন। সেই দৃশ্য ছিল অভূতপূর্ব, যা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

সেদিনের মহাসমাবেশে হেফাজতে ইসলাম তাদের ১৩ দফা দাবি পুনরায় তুলে ধরে এবং ইসলামবিরোধী অপপ্রচার বন্ধে সরকারের প্রতি কঠোর বার্তা দেয়। সেই সমাবেশ প্রমাণ করে দেয়—ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নবীপ্রেমের প্রশ্নে এ দেশের সাধারণ মানুষ এখনও একত্রিত হতে পারে এবং আলেম সমাজের নেতৃত্বে বিশাল জনআন্দোলন গড়ে উঠতে পারে।

এই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তিনি রাজনৈতিক মঞ্চের জনপ্রিয় বক্তা না হলেও তার ইখলাস, দীনী খেদমত এবং আলেমসমাজে গ্রহণযোগ্যতা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে তার নেতৃত্বে লাখো মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসে। ৬ এপ্রিলের লংমার্চ তাই শুধু প্রতিবাদ নয়, বরং আল্লামা শফীর প্রতি মুসলিম জনতার গভীর আস্থা ও ভালোবাসারও প্রকাশ হয়ে দাঁড়ায়।

৬ এপ্রিলের এই লংমার্চ পরবর্তী ৫ মে’র ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করে। ৫ মে সারাদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় প্রবেশের চেষ্টা করলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে বাধা দেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরুদ্ধ করা হয়, পরিবহন চলাচল সীমিত করা হয়। তবুও নানা বাধা অতিক্রম করে লাখো মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করে শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়।

পরবর্তীতে ওই অবস্থানই ভয়াবহ ও রক্তাক্ত পরিণতির দিকে গড়ায়। ৫ মে গভীর রাতে শাপলা চত্বরে অভিযান চালিয়ে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হয়। টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, গ্যাস গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও গুলির মাধ্যমে আলেম-ওলামা, হাফেজ, মাদরাসা ছাত্র ও সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। সেই ঘটনার প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা নিয়ে আজও বিতর্ক ও নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। তবে অনেকের কাছে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

তবে ৬ এপ্রিলের লংমার্চের তাৎপর্য কেবল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ নয়। এই দিন দেখিয়ে দিয়েছিল—ইসলাম, কুরআন-সুন্নাহ এবং নবীপ্রেমের প্রশ্নে এ দেশের মানুষ আজও একত্রিত হতে পারে। আলেমদের নেতৃত্বে সংঘটিত এই গণজাগরণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হৃদয়ে গৌরবময় স্মৃতি হয়ে আছে এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

আজও ৬ এপ্রিল ফিরে এলে স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ঢাকামুখী কাফেলা, জনসমুদ্র, ঈমানি আবেগ, আল্লামা শফীর নেতৃত্ব এবং সেই প্রতিজ্ঞা—যা এক সময় ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল। তাই হেফাজতের ঐতিহাসিক লংমার্চ শুধু একটি কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের ইসলামি আন্দোলনের ইতিহাসে আত্মমর্যাদা, ঐক্য, ত্যাগ এবং ঈমানি জাগরণের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222