জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকার বাসভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা সমন্বয় করলেও রাজধানীসহ সারাদেশের গণপরিবহন খাতে তার বাস্তব প্রতিফলন নেই। নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী চলার নির্দেশ থাকলেও অধিকাংশ বাসেই তা মানা হচ্ছে না, বরং বিভিন্ন রুটে খেয়ালখুশিভাবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ বাড়ছে।
রুট অনুযায়ী ঢাকাসহ সারাদেশে বাস-মিনিবাসের নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করলেও যাত্রীদের অভিযোগ- বাসে সেই তালিকা প্রদর্শন করা হচ্ছে না, আর যেখানে আছে সেখানেও তা উপেক্ষা করা হচ্ছে। রাজধানীর ছোট দূরত্ব থেকে শুরু করে দূরপাল্লার রুট পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই বাড়তি ভাড়া আদায় অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর কার্যকর নজরদারির ঘাটতি, নিয়মিত অভিযান না থাকা এবং এসি বাসের ভাড়ায় স্পষ্ট নীতিমালার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে সরকার নির্ধারিত ভাড়া আর বাস্তব ভাড়ার মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান, যার চাপ সরাসরি পড়ছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আগেই বেড়েছে। তারপরও সরকার দেশের বাজারে ভর্তুকি দিয়ে আগের দামে তেল সরবরাহ করে আসছিল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ১৮ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা আসে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর ১১ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার।
নতুন তালিকায় রাজধানী ও দূরপাল্লার সব পথেই প্রতিটি বাস রুটের জন্য আলাদা আলাদা তালিকা রয়েছে। রাজধানীর বাসের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। বাড়তি ভাড়া আদায় করা যাবে না। এ ছাড়া গ্যাসচালিত বাসের ক্ষেত্রে নতুন ভাড়া হার কার্যকর হবে না। এ ছাড়া ভাড়া ভগ্নাংশ হলে ৫০ পয়সার বেশি হলে ১ টাকা যুক্ত হবে। ৫০ পয়সার কম হলে সেটা নেওয়া যাবে না। সরকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে না। ফলে এই শ্রেণির বাসের ভাড়া পরিবহন মালিকদের ইচ্ছার ওপর এবং নির্দিষ্ট পথে প্রতিযোগিতার ওপর নির্ধারিত হয়। এ ছাড়া বাসের মান ও আসন সংখ্যা কত, সেটিও ভাড়া নির্ধারণের ওপর প্রভাব ফেলে।
সূত্রে জানা গেছে, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। গাড়িতে চার্ট প্রদর্শনের নিয়ম থাকলেও এখনও কার্যকর হয়নি। অথচ আদায় হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। ২০২২ সালে ডিজেলের মূল্য বেড়ে হয়েছিল ১১৪ টাকা প্রতি লিটার। তখন সে অজুহাতে বাস মালিকরা ভাড়া বাড়ালেও পরে যখন দাম কমেছে, ভাড়া কিন্তু আগের মতোই নিয়েছে। খিলক্ষেত থেকে বনানী ১৫ টাকা। আদায় হচ্ছে ২০ টাকা। ২২ টাকার ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ২৫ টাকা, আবার ২৭ টাকা ভাড়া হলে আদায় করা হচ্ছে ৩০ টাকা।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহনকর্মীদের বাগবিতণ্ডার খবর পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে বিআরটিএর ভূমিকা চোখে পড়েনি গতকাল। সংস্থাটির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে চড়া ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার তথ্য মেলেনি। এ বিষয়ে বিআরটিএর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মীর তারিকুল ওমর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতেও আগ্রহী নন।
মিরপুরের চিড়িয়াখানা থেকে শ্যামলী, আসাদ গেট, ফার্মগেট ও প্রেসক্লাব হয়ে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের পথে চলাচলকারী বাসগুলোর ভাড়ার তালিকা অনুসারে, এই পথের মোট দূরত্ব ২১ কিলোমিটার। কেউ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাতায়াত করলে ভাড়া গুনতে হবে ৫৩ টাকা। সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা দিয়ে একজন যাত্রী চিড়িয়াখানা থেকে টেকনিক্যাল মোড় পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারবেন। শ্যামলী পর্যন্ত যাতায়াত করলে ভাড়া দিতে হবে ১৪ টাকা। একইভাবে ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে শ্যামলী থেকে উঠে ফার্মগেট পর্যন্ত যাতায়াত করা যাবে। কিন্তু গতকাল ২০ টাকার নিচে কোনো আদায় হয়নি। মিরপুর ১০ নম্বর থেকে কাজীপাড়া শেওড়াপাড়া যেখানেই নামুক যাত্রীরা ভাড়া গুনতে হয়েছে ২০ টাকা। কিছু গাড়িতে সর্বনিম্ন ৪০ টাকা ভাড়া আদায়ের অভিযোগ আছে মিরপুর রোডে। সিটিং সার্ভিসের নামে ২১ কিলোমিটারের গোটা পথের ভাড়া গচ্চা দিতে হয়েছে যাত্রীদের। রাজধানীর ফুলবাড়িয়া বা গুলিস্তান থেকে গাজীপুরের পথে বেশ কিছু বাস চলাচল করে। এ পথের মোট দূরত্ব সাড়ে ৪১ কিলোমিটার। প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা। কেউ ফুলবাড়িয়া বা গুলিস্তান থেকে গাজীপুর পর্যন্ত গেলে ভাড়া হবে ১০৫ টাকা। ফুলবাড়িয়া থেকে মগবাজার পর্যন্ত সর্বনিম্ন ভাড়া, অর্থাৎ ১০ টাকায় যাতায়াত করতে পারবে। এর বেশি যাতায়াত করলে বাড়তি কিলোমিটার হিসাবে ভাড়া যুক্ত হবে। চট্টগ্রাম মহানগরে বাস ভাড়ার তালিকা অনুসারে, কালুরঘাট ব্রিজ থেকে চট্টগ্রাম নিউমার্কেট পর্যন্ত মোট দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা হিসেবে ভাড়া হবে ৩৫ টাকা। সর্বনিম্ন ১০ টাকা ভাড়ায় চকবাজার মসজিদ থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত পথ চলাচল করা যাবে। একইভাবে কালুরঘাট ব্রিজ থেকে শরাফত পেট্রলপাম্প পর্যন্ত যেকোনো গন্তব্যে ভাড়া হবে ১০ টাকা। চট্টগ্রাম নিউমার্কেট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পথের দূরত্ব ১৮ দশমিক ৬ কিলোমিটার। কেউ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গেলে ভাড়া পড়বে ৪৭ টাকা। সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা দিয়ে যাওয়া যাবে নিউমার্কেট থেকে বাদামতলী পর্যন্ত।
আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার পথের বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা। এটি ৫১ আসনের বাসের জন্য। তবে দূরের পথে যাত্রীদের আরামদায়ক যাতায়াতের জন্য অনেক কোম্পানি বড় বাসে আসন কমিয়ে ৪০-এ নামিয়ে চালায়। এ ক্ষেত্রে ভাড়া বাড়তি দিতে হবে। এ ছাড়া দূরের পথে ফেরি ও সেতুর টোল থাকলে সেটাও ভাড়ায় যুক্ত হবে। সব মিলিয়েই নতুন ভাড়ার তালিকা তৈরি করেছে বিআরটিএ।
ঢাকার গাবতলী থেকে মেহেরপুর ভায়া পাটুরিয়া, ফরিদপুর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা রুটের দূরত্ব ২৪৯ কিলোমিটার। টোলসহ ভাড়া ৬২৮ টাকা ৫১ সিটের গাড়িতে। ৪০ সিট হলে ৮০১ টাকা। আদায় করা হচ্ছে এক হাজার টাকা। ঢাকা-নাটোর ভায়া নবীনগর, চন্দ্রা, টাঙ্গাইল, যমুনা সেতু, নলকা, বড়াইগ্রাম দূরত্ব ২০৩ কিলোমিটার। টোলসহ ভাড়া ৬১৩ টাকা। আদায় করা হচ্ছে ৭৫০ টাকা। একইভাবে ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব ২৪২ কিলোমিটার। এই পথে টোল বাবদ ৪৫০ টাকা যুক্ত হবে। এ ক্ষেত্রে ৫১ আসনের বাসে যাত্রীপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫২ টাকা। আর ৪০ আসনের বাসে ভাড়া হবে ৭০৪ টাকা। সায়েদাবাদ থেকে কুমিল্লার দূরত্ব ১০২ কিলোমিটার। টোলসহ ৫১ আসনের বাসের যাত্রীপ্রতি ভাড়া হবে ২৪০ টাকা। আর ৪০ আসনের বাসভাড়া ৩০৬ টাকা। আদায় করা হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। এ ছাড়া সায়েদাবাদ থেকে সিলেটের দূরত্ব ২৫৭ কিলোমিটার। এই পথে টোলসহ ৫১ আসনের বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৮০ টাকা। আর ৪০ আসনের বাসভাড়া হবে ৭৪০ টাকা। ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাট হয়ে বরিশালের দূরত্ব ২৪২ কিলোমিটার। এই পথের বাসে যাত্রীপ্রতি ফেরির বাড়তি টোল যোগ হবে ৭৬ টাকা (৫১ আসন) থেকে ৯৭ টাকা (৪০ আসন)। সে হিসাবে ৫১ আসনের বাসে ঢাকা থেকে বরিশালের ভাড়া ৬১৬ টাকা। আর ৪০ আসনের বাস ভাড়া ৭৮৫ টাকা। অন্যদিকে সায়েদাবাদ থেকে পদ্মা সেতু হয়ে বরিশালের দূরত্ব ১৭১ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু, মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েসহ প্রতিটি বাসে টোল দিতে হয় তিন হাজার টাকার কাছাকাছি। সে হিসাবে এই পথে প্রতিটি যাত্রীকে টোল বাবদ ৮৩ টাকা (৫১ আসন) থেকে ১০৬ টাকা (৪০ আসন) বাড়তি দিতে হবে। সায়েদাবাদ থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ৫১ আসনের বাসে বরিশাল পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৬৪ টাকা। আর ৪০ আসনের বাস ভাড়া হবে ৫৯২ টাকা। ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত দূরত্ব ১১৬ কিলোমিটার। এই পথে কোনো টোল নেই। ৫১ আসনের বাসে যাত্রীপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫৯ টাকা। আর ৪০ আসনের বাস ভাড়া হবে ৩৩০ টাকা। মহাখালী থেকে রাজশাহী বা রংপুরের দিকে গেলে যমুনা সেতুসহ অন্যান্য সেতুতে ১ হাজার ৫০ টাকা টোল যুক্ত হবে। এর মধ্যে শুধু যমুনা সেতুর টোলই ১ হাজার টাকা। নতুন তালিকা অনুসারে, মহাখালী থেকে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নাটোর হয়ে রাজশাহী পর্যন্ত দূরত্ব ২৬৭ কিলোমিটার। এই পথে ৫১ আসনের বাসে যাত্রীপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২৫ টাকা। আর ৪০ আসনের বাসভাড়া হবে ৭৯৭ টাকা। মহাখালী থেকে টাঙ্গাইলের দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। ৫১ আসনের বাসে ভাড়া হবে ২০১ টাকা। আর ৪০ আসনের বাস হলে ভাড়া আসবে ২৫১ টাকা। চট্টগ্রাম মহানগর থেকে বিভিন্ন উপজেলা ও জেলার পথে চলাচলকারী বাসগুলোর ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা। চট্টগ্রাম থেকে ফেনী হয়ে সোনাপুর পর্যন্ত ১৪৭ কিলোমিটার। এই পথে ৫১ আসনের বাসের ভাড়া হবে ৩২৮ টাকা। আরামদায়ক যাতায়াতের জন্য বড় বাসের আসন কমিয়ে ৪০ আসনে রূপান্তর করলে ভাড়া গুনতে হবে ৪১৮ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার দূরত্ব ১৫৪ কিলোমিটার। ৫১ আসনের বাসের ভাড়া হবে ৩৪৩ টাকা। আর ৪০ আসনের বাসের ক্ষেত্রে ভাড়া দাঁড়াবে ৪৩৭ টাকা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের দাম ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল। তখন বাসের ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ৪০ পয়সা বা ২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল সরকার। ভাড়া বাড়ানোর ২৫ দিনের মাথায় ২৯ আগস্ট তা আবার কমানো হয়েছিল; তখন প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৫ টাকা কমিয়ে ১০৯ টাকা করা হয়। এরপর ১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলচালিত বাস-মিনিবাসের ভাড়া ৫ পয়সা কমানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছিল সরকার। কিন্তু কোথাও সেটি কার্যকর করেননি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। এর দুই বছর পর ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল প্রতি লিটার ডিজেলের দাম আরও ৩ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১০৬ টাকা। দাম কমানোর পর সেদিন পরিবহনের ভাড়া ৩ পয়সা কমানোর সিদ্ধান্ত দেওয়া হলেও সেটিও কার্যকর হয়নি। এর আগে ২০১৬ সালে বাস ভাড়া ৩ পয়সা এবং ২০১১ সালেও ২ পয়সা কমানো হয়েছিল। কিন্তু পরিবহন মালিকরা সেটি মানেননি। সরকারের পক্ষ থেকে সেটি কার্যকর করতে দেখা যায়নি। গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১১৫ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০২২ সালের দামের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাস্তবে ডিজেলের দাম লিটারে এক টাকা বেড়েছে। কিন্তু ভাড়া বেড়েছে কিলোমিটার প্রতি ১১ পয়সা।
জ্বালানির দাম বাড়ার পর বাস ভাড়া পুনর্নির্ধারণের জন্য বাস মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বসে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সেখানে দূরপাল্লা ও মহানগরের চলাচলকারী বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২৮ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয় মালিকদের তরফে। সেদিন প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠকের পরও সমঝোতা না হওয়ায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার মন্ত্রণালয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত গত বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। সেসময় সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, ন্যূনতম ভাড়া (৮ টাকা ও ১০ টাকা) অপরিবর্তিত থাকবে এবং তা বাড়ানো হবে না।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, ভাড়ার তালিকা পরিবহন মালিকরা মানবে না এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ভাড়া মনিটরিং কোনো কিছুই করা সম্ভব না। বিআরটিএসহ সরকারের সংস্থা বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ এবং সরকারের অন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে এগুলো সব কাঠামোগুলো সংস্কার করতে হবে। সরকারের নিজস্ব গণপরিবহন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। কিন্তু তা করা হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে মানুষ বেসরকারি পরিবহনের ওপর জিম্মি। সে সুযোগটাই নিচ্ছে তারা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, তেলের যে দামটা বেড়েছে, ওটাই সমন্বয় করেছে। ভাড়া বাড়েনি। সরকার বলেছে একসঙ্গে বাড়ালে জনগণের ওপর চাপ পড়বে। সরকার নির্ধারিত ভাড়া আদায় হবে। কেউ বেশি নিলে আমরাও ব্যবস্থা নেবে। সরকারও পদক্ষেপ নেবে।
বিআরটিএর এনফোর্সমেন্ট বিভাগ জানিয়েছে, ভাড়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিআরটিএর মোবাইল কোর্ট চলমান। এটি নিয়মিত কাজ। তবে পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিআরটিএর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় কোনো চেয়ারম্যান নেই। সংস্থাটির দায়সারা গোছের কাজ করে। বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণ কমিটির সদস্য ১১ জন। তাদের মধ্যে বিআরটিএর তিনজন এবং সড়ক মন্ত্রণালয়ের একজন, সরকারি সংস্থা ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) একজন, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) একজন। মালিকপক্ষের রয়েছেন কার্যত চারজন-বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জে আর শহীদ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি এমএ বাতেন এবং সরকারের পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির উপমহাব্যবস্থাপক শুকদেব ঢালী। যাত্রীদের প্রতিনিধি মাত্র একজন। তিনি হলেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধি আইনজীবী বাহাদুর সাজেদা আক্তার। ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটির প্রধান ছিলেন বিআরটিএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর। দেশের পণ্য ও যাত্রীবাহী পরিবহনের বেশির ভাগই ডিজেলে চলাচল করে। এর মধ্যে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে দেয় না। শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নয় (নন-এসি), এমন বাস-মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় বিআরটিএ। এসি বাসের ভাড়া মালিকরা ইচ্ছামতো নির্ধারণ করেন এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, শিগগির এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। এ নিয়ে পরিবহন নেতা সাইফুল আলম বলেন, এসি বাস বিভিন্ন ক্যাটাগরির। দাম ও মান মান ভিন্ন। তাই সবকিছু পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
হাআমা/
