শাপলা চত্বরের রক্তাক্ত রাত: রাষ্ট্রীয় দমননীতির এক নির্মম দলিল

আব্দুল্লাহ কাসিম আজওয়াদ

by hsnalmahmud@gmail.com

২০১৩ সালের ৫ মে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক রাত, যা শুধু একটি ঘটনার স্মৃতি নয়; বরং ইসলামপ্রিয় মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী ক্ষত হয়ে আছে। ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র মতিঝিলের শাপলা চত্বর সেদিন পরিণত হয়েছিল এক ভয়াল মৃত্যুকূপে। যেখানে কুরআনের হাফেজ, আলেম-ওলামা, মাদরাসার শিক্ষার্থী এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজধানীর রাজপথ।

যে মানুষগুলো এসেছিল মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে কটূক্তির প্রতিবাদ জানাতে, ঈমানি দায়িত্ব পালন করতে, ইসলাম অবমাননার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিতে, তাদের ওপর রাতের অন্ধকারে নামিয়ে দেওয়া হয় ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় হামলা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার সেই নিরস্ত্র জনতাকে দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করে চালায় এক পরিকল্পিত অভিযান, যা অনেকের চোখে ছিল সরাসরি গণহত্যা।

বিজ্ঞাপন
banner

এমনকি নামাজরত, জিকিররত কিংবা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়া লোকদের ওপর আলো নিভিয়ে নির্বিচারে আক্রমণ চালানো হয়।

এই ঘটনা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় শক্তির মাধ্যমে চালানো অন্যতম ভয়ংকর নিপীড়নের অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

ইসলামবিদ্বেষী উসকানি ও প্রতিবাদের সূচনা

২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই দেশে এক শ্রেণির ইসলামবিদ্বেষী ব্লগার ও লেখকের তৎপরতা প্রকাশ্যে বাড়তে থাকে। ‘মুক্তচিন্তা’ কিংবা ‘মুক্তমনা’ নামের ব্যানারে তারা আল্লাহ তাআলা, পবিত্র কুরআন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং ইসলামের মৌলিক আকীদা নিয়ে কটূক্তি ও অবমাননাকর বক্তব্য ছড়াতে থাকে।
এই সময় রাজীব হায়দার (থাবা বাবা), অভিজিৎ রায়সহ কয়েকজন ব্লগার বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে। অভিযোগ ওঠে, সরকার ও প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়েছে।

অন্যদিকে আলেম সমাজ যখন এসব অবমাননার প্রতিবাদ করে, তখন তাদের ‘জঙ্গি’, ‘উগ্রবাদী’ কিংবা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ হিসেবে প্রচার চালানো হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ইসলামপ্রিয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে এবং সেই ক্ষোভ একটি সংগঠিত আন্দোলনের দিকে মোড় নেয়।

হেফাজতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ: ধর্মপ্রাণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম

এই প্রেক্ষাপটে ২০১০ সালে হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে গঠিত হয় অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ও নবীপ্রেমিক জনগণের ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা করা এবং ইসলামবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিবাদ গড়ে তোলা।

হেফাজতের উত্থান দ্রুতই সারাদেশের কওমি মাদরাসা ও আলেম সমাজের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

গণজাগরণ মঞ্চ ও ইসলামবিদ্বেষের বিস্তার

২০১৩ সালের শুরুতে শাহবাগে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আত্মপ্রকাশ করে গণজাগরণ মঞ্চ। তাদের মূল দাবি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযোগ ওঠে, এই প্ল্যাটফর্মে এমন এক গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করেছে যারা ইসলামি মূল্যবোধ ও আলেম সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়াচ্ছে।

শাহবাগ কেন্দ্রিক বিভিন্ন স্লোগান, বক্তব্য ও ব্লগপোস্ট ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশ্বাসে আঘাত করে। অনেকেই মনে করতে শুরু করেন, এই আন্দোলনের আড়ালে ইসলামবিরোধী একটি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন তৈরি হচ্ছে, যার লক্ষ্য আলেম সমাজকে কোণঠাসা করা এবং ইসলামি মূল্যবোধকে অবমানিত করা।

এই পরিস্থিতি দেশের সাধারণ মুসলমানদের ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে।

১৩ দফা দাবি ও আন্দোলনের বিস্তার

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরপর হেফাজতে ইসলাম সরকার ও জাতির সামনে ১৩ দফা দাবি উপস্থাপন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল-

  • ইসলাম ও নবী করিম (সা.)-কে অবমাননার বিরুদ্ধে কঠোর আইন
  • ধর্ম অবমাননাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা
  • ইসলামি মূল্যবোধবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ করা

হাটহাজারীতে উলামা-মাশায়েখ সম্মেলনের মাধ্যমে আন্দোলন আরও সংগঠিত হয়। এরপর মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সীরাত মাহফিল, স্মারকলিপি প্রদান, এবং সর্বশেষ ঢাকামুখী লংমার্চসহ ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

৬ এপ্রিল: শাপলা চত্বরের ঐতিহাসিক মহাসমাবেশ

সরকারের বাধা, গণপরিবহন সীমিতকরণ এবং নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ৬ এপ্রিল মতিঝিলের শাপলা চত্বর পরিণত হয় লাখো মানুষের জনসমুদ্রে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

সেখান থেকে আবারও ১৩ দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয় এবং ঘোষণা আসে, দাবি না মানলে ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালিত হবে।

এ ঘোষণার পর থেকেই সরকার ও প্রশাসন হেফাজতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। মিডিয়া ও রাজনৈতিক প্রচারযন্ত্রে আন্দোলনকারীদের ‘উগ্রবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলে। কিন্তু বাস্তবে জনস্রোত থামানো সম্ভব হয়নি।

৫ মে: বাধা উপেক্ষা করে ঢাকায় তাওহিদী জনতার ঢল

৫ মে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় আসতে শুরু করেন। রাজধানীর প্রবেশপথে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যারিকেড, গণপরিবহন বন্ধ, ট্রেন চলাচলে বাধা এবং বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ সৃষ্টি করা হয়।

তবুও অনেকে হেঁটে, রিকশায়, ছোট যানবাহনে বা বিকল্প পথে ঢাকায় পৌঁছান। দিনভর বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটে। আহত ও ক্লান্ত কর্মীরা শেষ পর্যন্ত শাপলা চত্বরে জড়ো হয়ে অবস্থান নেন।

শাপলা চত্বরে আল্লামা বাবুনগরীর দৃঢ় নেতৃত্ব

হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে বিভিন্ন বাধার কারণে শাপলা চত্বরে আসতে দেওয়া হয়নি। সেই সংকটময় মুহূর্তে সংগঠনের মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী শাপলা চত্বরে উপস্থিত থেকে আন্দোলনকারীদের নেতৃত্ব দেন।

দিনভর উত্তেজনা, গুলির শব্দ, আতঙ্ক ও রক্তাক্ত পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি মঞ্চ ছাড়েননি। তিনি বারবার শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং কর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে চেষ্টা করেন।

রাত গভীর হওয়ার পর যখন পরিস্থিতি আরও অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখনও তিনি আশপাশেই ছিলেন। পরে অভিযানের সময় তিনিও হামলার শিকার হয়ে আহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়।

আলো নিভিয়ে শুরু হয় অভিযান: রাতের অন্ধকারে বিভীষিকা

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাপলা চত্বর ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় ভয়াবহ অভিযান।
অভিযোগ রয়েছে, এতে অংশ নেয় বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য, র‍্যাবের বিশেষ দল ও বিজিবির প্লাটুন।

রাত আনুমানিক ৩টার দিকে টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, গ্যাস গ্রেনেড নিক্ষেপ করে হামলা শুরু হয়। এরপর গুলি ও রাবার বুলেট ছোড়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য রয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে শাপলা চত্বর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

অনেক মানুষ আশ্রয় নেয় আশপাশের ভবন, অলিগলি ও ব্যাংক ভবনে। কিন্তু সেখান থেকেও টেনে বের করে মারধর, আটক এবং নিখোঁজ করার অভিযোগ উঠে আসে।

এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনকারীদের সম্পূর্ণভাবে ছত্রভঙ্গ করা এবং হেফাজতের নেতৃত্বকে আতঙ্কিত করে আন্দোলন দমন করা।

অভিযানের পর গ্রেপ্তার: বাবুনগরীর ওপর রিমান্ড ও নির্যাতনের অভিযোগ

অভিযানের পরদিন ৬ মে রাজধানীর লালবাগ এলাকা থেকে আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর হত্যা, হামলা, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার মতো মামলায় তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে অভিযোগ ওঠে, রিমান্ডে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের নামে চাপ সৃষ্টি, অপমান, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নানা ধরনের নিপীড়ন চালানো হয় বলে দাবি করা হয়।

তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। কিডনি জটিলতা দেখা দেয় এবং একাধিকবার ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয় বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।

দীর্ঘদিন চাপা থাকা অধ্যায়: বিচার অচল ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার কারণে

শাপলা চত্বরের ঘটনার পর বহু বছর ধরে এই ঘটনার প্রকৃত চিত্র প্রকাশে বাধা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। নিহতের সংখ্যা নিয়েও শুরু হয় বিতর্ক, ধোঁয়াশা এবং বিভ্রান্তি।

এক পক্ষ দাবি করে এটি ছিল ‘নিরাপত্তা অভিযান’, অন্য পক্ষ এটিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে এই ঘটনার রক্তাক্ত স্মৃতি কখনো মুছে যায়নি।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিচারপ্রক্রিয়ার নতুন গতি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা হয়। এরপর শাপলা চত্বরসহ বহু আলোচিত ঘটনার তদন্ত পুনরায় সামনে আসে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, শাপলা চত্বরের ঘটনার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে।

তদন্তে ঢাকায় অন্তত ৩২ জন হত্যার প্রমাণ মিলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামেও হত্যাকাণ্ডের আলামত পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়।

এই তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বহুদিনের বিচার দাবির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শাপলা চত্বর: ইতিহাসের রক্তাক্ত সাক্ষী

শাপলা চত্বরের সেই রাত কেবল একটি সংঘর্ষ নয়, এটি ছিল ধর্মীয় জনতার ওপর রাষ্ট্রীয় দমননীতির এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন রয়ে যায়—

  • কেন আলো নিভিয়ে গভীর রাতে অভিযান চালানো হলো?
  • কেন ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র মানুষের ওপর হামলা করা হলো?
  • কেন ঘটনাটি দীর্ঘদিন আড়াল করে রাখা হলো?
  • নিহত ও নিখোঁজদের প্রকৃত সংখ্যা আজও কেন বিতর্কিত?

শাপলা চত্বর আজও সেই রাতের সাক্ষী হয়ে আছে। আল্লামা বাবুনগরীর মঞ্চে অবিচল উপস্থিতি, হাজারো আলেম-তালিবে ইলমের আত্মত্যাগ, এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অভিযানের ভয়াবহতা, সবকিছু মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমোচনীয় রক্তাক্ত অধ্যায়।

এই ঘটনার বিচার ও সত্য উদঘাটন শুধু রাজনৈতিক হিসাব নয়, এটি ন্যায়বিচার, ইতিহাস এবং জাতির ভবিষ্যতের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222