ভয়াল তাণ্ডবের শিকার কওমিদের সেই শাপলাকথা

by naymurbd1999@gmail.com

কওমি মাদরাসা ভিত্তিক ইসলামী আন্দোলনের ঐতিহাসিক লিড দিয়েছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। আজ ৫ মে নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। এ রাষ্ট্র, এ সংস্কৃতি, এ ক্ষমতা কিংবা ২৪ এর জুলাই আন্দোলন-সবই শাপলা আন্দোলনের সূতিকাগার। শাপলা আন্দোলনে কওমি তরুণ বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে না দিলে ধীরে ধীরে আজকের রূপালি পর্দার উন্মেষ ঘটতো না। কী ছিলো সেই বিভীষিকাময় রাত। কী ঘটেছিল? এমন দিনের কি কেউ কামনা করেছিল? সরাসরি অংশগ্রহণ করা ব্যক্তিদের মুখের কথাই নিচে তুলে ধরা হলো- পড়ে দেখতে পারেন। শুধু ৩৬ নিউজ এর পাঠকের জন্য। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন আদিব আদইয়ান

আজ বিভীষিকাময় এক কাল দিন
-মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী
আজ ৫ মে বিভীষিকাময় এক কালোদিন। ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ কর্মসূচিতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানই ‘শাপলা গণহত্যা’ নামে পরিচিত। নাস্তিক ব্লগাররা যখন মহান আল্লাহ, মহানবী (সা.), পবিত্র কুরআন অবমাননা ও ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কটুক্তি করে এবং কুরআন সুন্নাহ বিরোধী নারী নীতিসহ ১৩ দফা দাবিতে হেফাজতের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির জেরে শাপলা চত্বরে এই গণহত্যা চালানো হয়, যাতে বহু মানুষ শহীদ হন আহত হন হাজারো আলেম ওলামা, হাফেজ, মুফতি, মুহাদ্দিস। অন্ধত্ব বরণ করেন অনেকে। পঙ্গু হয়ে যান অসংখ্য হেফাজত কর্মী সমর্থক।

বিজ্ঞাপন
banner

২০১৩ সালের ৫ মে’র মহাসমাবেশে যৌথ বাহিনীর রাতের অভিযান ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’য় কতজন নিরীহ সাধারণ মাদরাসার শিক্ষক-ছাত্রকে হত্যা করা হয় তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান এখনও পাওয়া যায়নি। ওই রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে কয়েক শত সাধারণ শিক্ষক-ছাত্রকে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছিল।

পুরো মতিঝিল ও এর আশপাশ এলাকার বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দিয়ে নিরীহ মাদরাসা ছাত্রদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়। অভিযানের পর দ্রুত সিটি করপোরেশনের গাড়ি এনে লাশগুলো অজ্ঞাত স্থানে গুম করে ফেলে বলে অভিযোগ রয়েছে।

হেফাজতের নেতাকর্মী তথা আলেমদের নির্মূলের নির্দেশদাতার ইচ্ছা পূরণে পুলিশের তৎকালীন আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার ও র‌্যাব ডিজিসহ অনেক কর্মকর্তা সেই নিষ্ঠুর নির্যাতন আর খুনের দিনটিকে ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ হিসাবে অবহিত করে উল্লাস করেছিলেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে হেফাজতের নেতাকর্মীদের হত্যাকা- নিয়ে কেউ কোনো সত্য প্রকাশ করতে পারেনি। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ৬১ জনকে হত্যার তালিকা প্রকাশ করে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে পড়ে।

লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ

হাসিনা এলে আবার মিডিয়া লিখবে ‘হেফাজতের তাণ্ডব’
শরীফ মুহাম্মদ
৫ আগস্ট ‘২৪ তারিখে হাসিনা উড়াল দেওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের দেশের প্রধান গণমাধ্যমগুলো শাপলা (৫ মে ২০১৩)- কে এভাবেই দেখেছে, এভাবেই দেখিয়েছে। মাঝখানে কোনো ব্যাখ্যা নেই, ইনিয়ে বিনিয়ে বলা-কওয়া নেই; ঘোমটা দিয়ে একটু একটু সরে এসেছে। তাদের মতো করে সময় আবার অনুকূল হয়ে উঠলে, ‘হাসিনাময়’ হয়ে উঠলে ‘হেফাজতের তাণ্ডব’ সদর্পে শিরোনামে চলে আসবে কিনা কে বলতে পারে!
লেখক : কথা সাহিত্যিক ও দাঈ

শাপলায় কেয়ামত পর্যন্ত রক্ত-গন্ধ একাকার থাকবে
-মাওলানা লোকমান সাদী
আজ ঐতিহাসিক ৫ ই মে ! যে তারিখটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে দুর্বলের প্রতি সবলের, মজলুমের প্রতি জালেমের, তাওহিদবাদীদের প্রতি সেকুলারিজমের নির্মমতার ইতিহাস হয়ে!
সেই শাপলার চতুর্পাশ কেয়ামত পর্যন্ত রক্তের গন্ধ সংরক্ষণ করবে ইনশাআল্লাহ। নবী প্রেমিক ঈমানদার জনতা, আলেম উলামা ও তালিবুল ইলিমদের আর্ত চিৎকারে ভারি হয়ে যাওয়া শাপলার আঙিনা ও আকাশ যুগযুগান্তর মনে করিয়ে দেবে এই স্মৃতি। ২০১৩ সালের সেই ৫ ই মে ভয়াল বিদঘুটে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাতের ইতিহাস দ্বীনের তরে জীবন বাজী রেখে ঈমান আগলে রাখার সবক মনে করিয়ে দেবে যুগ যুগ ধরে ইনশাআল্লাহ।
আল্লামা আহমদ শফি রাহি. আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রাহি. সহ সেই শাপলা রনাঙ্গনের প্রতিটি শহীদকে আল্লাহ উচ্চ মাকাম দান করুন আখিরাতে।

৫ই মে শাপলা চত্বর শহীদ দিবস
-গাজী ইয়াকুব
আজ ঐতিহাসিক ৫ ই মে শাপলা চত্বর শহীদ দিবস। দিনটিকে অনেকে অনেকভাবেই মূল্যায়ন করবেন! হেফাজতের জন্য নিজের ব্যবসা বাণিজ্য, মামলা মোকাদ্দমা, প্রায় এক বছর আত্মগোপন,অসুস্থদের সেবা, চিকিৎসা সহায়তা, জেলবন্দীদের পরিবারকে দেখভাল, কি-না করেছি? কাছের মানুষদের সবকিছুই জানা।

বিনিময়? শুধুমাত্র আল্লাহর কাছেই আশা করবো। এখন মানবিক কাজ ছাড়া রাজনৈতিক অরাজনৈতিক কোনো সংগঠনের সাথেই আমার সম্পৃক্ততা নাই।

আমৃত্য দেশজাতীর স্বার্থে টুকটাক মানবিক কাজ নিয়েই পরে থাকতে চাই। আজকের এই দিনে হেফাজতের ছোট থেকে ছোট একজন কর্মী হিসেবে শুধু এটুকুই বলবো অরাজনৈতিক হেফাজতকে রাজনীতি থেকে নিরাপদ রাখা হোক।

হেফাজতের নাম ভাঙ্গিয়ে বা মুরুব্বীদের পরিচয় বিক্রি বন্ধ হোক। মুরুব্বীদের কথা বা পরামর্শে আমাদের পথচলা সহজ হোক।
লেখক : কেন্দ্রীয় ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ

কালেমা পড়তে পড়তে মৃত্যুর মিছিলে
-রিদওয়ান হাসান
৫ মে ২০১৩, ৫ আগস্ট ২০২৪- সাধারণ আলেম সমাজ সংসদ ভবনের কোনো এক দেয়ালে লেখা। আমিই এটা লিখেছিলাম।
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার সাথে মৃত্যু উপেক্ষা করে যাত্রাবাড়ী পাড়ি দিয়ে গণভবনে গিয়ে শোকরানা আদায়ের পর লিখেছিলাম এটা।
আমরাই ছিলাম প্রথম কাফেলা, যারা যাত্রাবাড়ী থেকে কালেমা পড়তে পড়তে এই মৃত্যুর মিছিলে শরিক হচ্ছিলাম।
এই মিছিল যখন সায়েদাবাদ জনপদ মোড় পার হয়, তখন আবারও নেমে আসে রণক্ষেত্র। ওই সময় যাত্রাবাড়ীতে প্রায় ৫৪ জন শহীদ হয়।
শাপলা থেকে জুলাই। রক্তের আকরে লেখা আমাদের ইন্তেফাদা।
লেখক : আহ্বায়ক, বাংলাদেশ গ্রিণ পার্টি।

৫ মে মাদরাসা বন্ধ রাখতে পারতো বেফাক
-এহসান সিরাজ
৫ মে দিনটিকে ‘কালো দিবস’ ঘোষণা দিয়ে বেফাক পারে মাদরাসাগুলোর পাঠদান বন্ধ রাখার নির্দেশ দিতে। এ দিন ক্লাস বন্ধ রাখলে ইতিহাসের চর্চা হবে। না হলে অচিরেই হারিয়ে যাবে ঐতিহাসিক এক অধ্যায়।

লেখক ও গবেষক

হেফাজতের দৃশ্যমান কোন কাজ নেই
-রোকন রাইয়ান
৫ মে নিয়ে হেফাজতের কোন প্রোগ্রাম নেই। দৃশ্যমান কোন কাজও করেনি এ পর্যন্ত।
আসলে হেফাজতের নেতৃবৃন্দ এখন আছেন অন্যের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে। কে কোন দলে গেলো, কার সাথে থাকা যাবে আর যাবে না এইসব আজগুবি প্রকল্পে।
শাপলার গণহ/ত্যার বিচার, শহীদ পরিবারের সহায়তা, আদর্শিক সেই আন্দোলনকে বেগবান করা- কোনটাই হয়নি। বরং নেতাকর্মীরা নানা দল উপদলে যুক্ত হয়ে হেফাজতের প্রভাবকে বিলীন করেছেন।
হেফাজতে এখন দরকার বড় সংস্কার বা বিলুপ্তি। রাজনৈতিক নেতারা যতদিন কমিটিতে আছেন তারা না চাইলেও হেফাজত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হবে।
আর সংস্কার করা না গেলে বিলুপ্তি দরকার এ কারণে, আল্লামা আহমদ শফি ও বাবুনগরী রহ. এর মৃত্যুর পর পূর্বের সিলসিলায় একে ধরে রাখার মত নেতৃত্ব খুবই কম আছে।
নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যারা যোগ্য তারা ভিন্ন ব্যানার নিয়ে কাজ করতে পারেন, তাতে হেফাজতের একসময়কার সফল নেতৃত্ব আর কৃতিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।

লেখক : চেয়ারম্যান, কওমি উদ্যোক্তা

হেফাজতকে এভাবে খেয়ে দিলেন!
-মুফতি নাজমুল ইসলাম কাসেমী
হেফাজতকে এভাবে খেয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ! আজ ঐতিহাসিক ৫ই মে। কিন্তু কেন্দ্রীয় হেফাজতের পক্ষ থেকে বড় কোনো প্রোগ্রাম দূর কি বাত; অন্তত একটি দোয়া মাহফিলও চোখে পড়লো না।
এদিকে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক বিভিন্ন সংগঠন ও নেতারা ডকুমেন্টারি, মানববন্ধন, পোস্ট-ভিডিওর মাধ্যমে শাপলার ঘটনার বিচারের দাবি তুলেছেন।
অথচ যাদের ডাকে অনেকে তার জীবন উৎসর্গ করল, সেই হেফাজতের কেউ কেউ আজ প্যাকেট হয়ে আছে নির্দিষ্ট একটি গণ্ডিতে! শত ধিক তাদের জন্য। আফসোস…
লেখক : গবেষক ও শিক্ষক

স্মৃতিতে শাপলা চত্বর
-মাওলানা ইসমাঈল আহমদ
এক ঐতিহাসিক ও বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বয়ান এটি। ইতিহাসের বাঁক বদলানো সেই দিনগুলোর কথা আজও মানসপটে ভেসে ওঠে। তখন আমি ২০১১-২০১২ শিক্ষাবর্ষে ঢাকার জামিয়া ইব্রাহিমিয়া মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের ছাত্র ছিলাম। শাপলা চত্বরের সেই ঐতিহাসিক সমাবেশে যোগ দিতে আমাদের কাফেলা যাত্রা শুরু করেছিল হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে। সাথে ছিলেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম, হাফেজ শাহেদ আলী, হাফেজ মকবুল হাসান এবং হাফেজ বাহারসহ আরও অনেকে। যাত্রা মোটেও সুগম ছিল না; পথে পথে ছিল নানা প্রতিবন্ধকতা। কোনো যানবাহন আমাদের নিতে রাজি হচ্ছিল না। অবশেষে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ৫ই মে ফজরের আগেই আমরা ঢাকার মাদরাসায় পৌঁছাই এবং নাস্তা সেরে রাজপথে নেমে আসি।

রোদ-বৃষ্টির সেই অদম্য মিছিল:বিশাল জনসমুদ্রের সাথে আমরা ডেমরার দিকে অগ্রসর হতে থাকি। সেদিন প্রকৃতির অদ্ভুত এক খেলা লক্ষ্য করেছিলাম। কখনো মুষলধারে বৃষ্টিতে শরীর ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছিল, আবার পরক্ষণেই কড়া রোদে সেই ভেজা কাপড় শরীরেই শুকিয়ে যাচ্ছিল। শারীরিক এই কষ্ট আমাদের উদ্দীপনাকে ম্লান করতে পারেনি। দুপুর ১২টায় শাপলা চত্বরের দিকে চূড়ান্ত অভিযাত্রা শুরু হয়। রিকশায় থাকা মাইক দিয়ে যখন স্লোগান দিচ্ছিলাম, মানুষের উৎসাহ দেখে মনে হচ্ছিল প্রতিটি আওয়াজ আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় দুপাশে সারিবদ্ধ জলকামান দেখে সহযাত্রী ভাইকে বলেছিলাম, “দেখুন, তারা আমাদের জন্যই প্রস্তুত হয়ে আছে!” অব্যক্ত শঙ্কা ও বিচ্ছিন্ন জনস্রোত:বিকেলের দিকে আরামবাগের সিএনজি পাম্পের কাছে আমার এক ছাত্র ভাইকে বসে থাকতে দেখি। তাকে অনুরোধ করেছিলাম আমাদের সাথে চলে আসতে, কিন্তু সে তখন আসেনি। মাগরিবের পর বায়তুল মোকাররম এলাকায় মানুষের প্রবল চাপে আমি সাথিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। সন্ধ্যা নামতেই এক রহস্যময় অন্ধকার চারপাশ ছেয়ে ফেলল। লাখো মানুষের ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিল।

পরিস্থিতির অবনতি দেখে বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম, কিন্তু তখনই খবর এল—সামনে গেলেই গুলি চালানো হবে। মসজিদে অবরুদ্ধ কালবেলা:প্রাণ বাঁচাতে এশার নামাজের সময় আরামবাগ মসজিদে প্রবেশ করলাম। সেখানে চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে আমার শেষ সঙ্গী মামাকেও হারিয়ে ফেললাম। মসজিদের দোতলায় অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই শিউরে উঠলাম। দেখলাম, প্রশাসন বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছে।

লেখক : মাদরাসা মুহতামিম

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222