দেশে আবারও গ্যাস সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে জ্বালানি বিভাগের এক ‘রহস্যজনক’ সিদ্ধান্ত। প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার দুই কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের ঠিক আগমুহূর্তে প্রত্যাহার করায় প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে। অথচ জুন মাসে আসার কথা ছিল এসব এলএনজির চালান। এখন সময়মতো এলএনজি না এলে দেশে সৃষ্টি হতে পারে ভয়াবহ গ্যাস সংকট। ঈদের ছুটির কারণে অল্প সময়ে ওই এলএনজি কেনা সহজ নয় বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে স্পট থেকে ওই এলএনজি কেনার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ক্রয় কমিটিতে উত্থাপনের জন্য এজেন্ডাভুক্ত করেছিল জ্বালানি বিভাগ। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সচিবের সই করা সারসংক্ষেপও পাঠানো হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। কিন্তু প্রস্তাবিত এলএনজির দাম বেশি হওয়ার কথা বলে দুই কার্গো এলএনজি ক্রয়ের প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন পেট্রোবাংলা এ ব্যাপারে আবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করবে।
জানা যায়, প্রত্যাহার করা দুই কার্গো এলএনজির দরপত্রের মেয়াদ বুধবার রাত ৮টায় শেষ হয়ে গেছে। এখন এলএনজি আনতে হলে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি বিভাগ সবকিছু পরীক্ষা করে সারসংক্ষেপ পাঠিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। তাহলে মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শুরুর আগমুহূর্তে কেন প্রত্যাহার করা হলো? এ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন।
তবে অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ক্রয় কমিটির বৈঠকের আগ মুহূর্তে ‘আইসবার্গ’ নামে একটি কোম্পানি সস্তায় (প্রস্তাবের চেয়ে কম দামে) এলএনজি বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে জ্বালানি বিভাগে। তাই হুট করে ক্রয় কমিটি থেকে দরপত্রের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। আইসবার্গের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রতি ইউনিট এলএনজি ১৭ ডলারে দিতে পারবে। আর বুধবার ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা থেকে ফিরিয়ে আনা দুই প্রস্তাবে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম দেওয়া হয়েছে ১৯ দশমিক ৭০ ডলারের বেশি।
দেশে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয় দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে ১০০ কোটির বেশি। এ কারণে প্রতিমাসে ১১ কার্গোর বেশি এলএনজি কিনতে হয় পেট্রোবাংলাকে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৫-১৬ জুন এবং ২১-২২ জুনের জন্য সম্প্রতি পেট্রোবাংলা পৃথক দরপত্র আহ্বান করে। সেখানে ১৫-১৬ জুনের জন্য ৬টি কোম্পানির প্রস্তাব পায়। এর মধ্যে বিপি সিঙ্গাপুর লিমিটেড সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে। তার দর ১৯ দশমিক ৭৩ ডলার। দ্বিতীয় দরদাতা ছিল পসকো ইন্টারন্যাশনাল। তাদের দর ছিল ১৯ দশমিক ৭৫৮ ডলার। এই দামে এক কার্গো (৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ) এলএনজি আমদানির খরচ দেখানো হয়েছে ৮০০ কোটি ৩৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকা।
তেমনিভাবে ২১-২২ জুনের জন্য ডাকা দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় ভিটল এশিয়া সিঙ্গাপুর। তাদের দর ছিল প্রতি ইউনিট ১৯ দশমিক ৬৭ ডলার। তার নিকটম দরদাতা হচ্ছে বিপি সিঙ্গাপুর (১৯ দশমিক ৭৩ ডলার)। ভিটলের সর্বনিম্ন দর অনুযায়ী এক কার্গো এলএনজি আমদানিতে খরচ হবে ৮৩০ কোটি ৮৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। তবে জ্বালানি বিভাগ তাদের প্রস্তাবে বলেছিল, ৮-৯ জুন কার্গোর দর পড়েছে প্রতি ইউনিট ১৭ দশমিক ১৬ ডলার। ৯-১০ জুনের কার্গোর দর পড়েছিল ১৭ দশমিক ৩৬ ডলার এবং ১৪-১৫ জুনের কার্গোর দর পড়েছে প্রতি ইউনিট ১৭ দশমিক ২৪ ডলার। সে হিসাবে ভিটল এবং বিপির প্রস্তাব বেশি।
তবে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে তেল ও এলএনজির বাজার বেশ অস্থির। কখন কী দাম হয়, বলা কঠিন। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বুধবার এলএনজির দাম কিছুটা বেড়ে প্রতি ইউনিট গিয়ে ঠেকেছে ২০ ডলারের মতো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বুধবারের ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকের তারিখ এক সপ্তাহ আগে নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এলএনজি আমদানির ওই দুই প্রস্তাব ক্রয় কমিটির বৈঠকের এজেন্ডাভুক্ত করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বুধবার সকালে মৌখিকভাবে অনুরোধ করে জ্বালানি বিভাগ। দুপুরে এ ব্যাপারে জ্বালানি বিভাগ থেকে কাগজপত্র পাঠানো হয়। বিকালে বৈঠক শুরুর আগমুহূর্তে আবার সেই দুই প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়। মন্ত্রিসভা কমিটির সদস্যরা বিষয়টি জেনে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এর আগেও জ্বালানি বিভাগের বিভিন্ন প্রস্তাব বিশেষ করে সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় তেল কেনার প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
হাআমা/
