বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও রোবোটিক্স খাতে এক অভূতপূর্ব ও নতুন ইতিহাস গড়েছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বখ্যাত ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ’ (ইউআরসি) ২০২৬ প্রতিযোগিতায় বিশ্বমঞ্চে তৃতীয় এবং পুরো এশিয়ার মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম’। এই অনন্য অর্জনের মাধ্যমে কেবল বাংলাদেশই নয়, সমগ্র এশিয়ার জন্য তৈরি হয়েছে এক নতুন মাইলফলক। কারণ ইউআরসি প্রতিযোগিতার দীর্ঘ ২০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো এশীয় দল বিশ্বমঞ্চের সেরা তিনের তালিকায় (পোডিয়ামে) জায়গা করে নেওয়ার গৌরব অর্জন করল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউটা অঙ্গরাজ্যের হ্যাঙ্কসভিলে অবস্থিত মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে গত ২৭ থেকে ৩০ মে এই আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রোভার দল অংশ নেয়। ইউআইইউর সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবোটিক্স (সিএআইআর)-এর অধীনে পরিচালিত বাংলাদেশি এই দলটি প্রতিযোগিতার অত্যন্ত জটিল চারটি মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করে। মিশনগুলো ছিল মূলত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (সায়েন্স মিশন), স্বায়ত্তশাসিত বা স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন (অটোনোমাস নেভিগেশন), চরম পরিবেশে পরিচালনা সক্ষমতা এবং ইকুইপমেন্ট সার্ভিসিং।
বিশ্বের বাঘা বাঘা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে কাঁধ মেলাত লড়াই করে ইউআইইউ মার্স রোভার টিম মোট ৪০০ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট অর্জন করে তৃতীয় স্থান লাভ করে। এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত অনন্য মুনশিয়ানার জন্য দলটি ‘বেস্ট অটোনোমাস সিস্টেম’ বা সেরা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বিশেষ স্বীকৃতিও লাভ করেছে। প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অব এস অ্যান্ড টি মার্স রোভার ডিজাইন টিম ৪৬৯ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট পেয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। অন্যদিকে, ৪১২ দশমিক ৪১ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ নোভা রোভার টিম।
এবারের ইউআরসি প্রতিযোগিতায় বিশ্বের মোট ১১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় দল প্রাথমিকভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। বিভিন্ন ধাপের কঠোর ও নিবিড় মূল্যায়নের পর চূড়ান্ত মূল পর্বের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল মাত্র ৩৮টি দল। সেই চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাওয়ার পর বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকাকে উঁচিয়ে ধরে তৃতীয় হওয়া বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে এক বিশাল প্রাপ্তি। চূড়ান্ত পর্বে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, পোল্যান্ড, ভারত, বাংলাদেশ, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জাপান, মেক্সিকো ও তুরস্কসহ প্রযুক্তিবিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর রোভার দল অংশ নেয়। এর মধ্যে আরও একটি স্মরণীয় বিষয় হলো, ইউআইইউ মার্স রোভার টিম ২০২২ সাল থেকে টানা পাঁচবার এশিয়ার সেরা রোভার দল হওয়ার ধারাবাহিক গৌরব ধরে রেখেছে।
এই দলটির মূল পরামর্শক হিসেবে ছিলেন ইউআইইউ স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন অধ্যাপক ড. হাসান সারওয়ার এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. সুমন আহমেদ। একই সঙ্গে মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রভাষক মো. আবিদ হোসাইন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বমঞ্চের এই সাফল্য বাংলাদেশের তরুণদের মেধা, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার এক সুষ্পষ্ট প্রমাণ। রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, এমবেডেড সিস্টেম এবং মেকানিক্যাল ডিজাইনের মতো আধুনিক প্রযুক্তিখাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে এই অর্জন বিশ্ব দরবারে নতুনভাবে তুলে ধরেছে, যা ভবিষ্যতে দেশের তরুণ প্রজন্মকে মহাকাশ গবেষণা ও রোবোটিক্সে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করবে।
টিএইচএ/
