আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুযায়ী গাজা উপত্যকা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও, সেখানে উল্টো স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করছে ইসরায়েল। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিটের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে গাজা জুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর অন্তত ৪০টি সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সংগৃহীত স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনা হয়েছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর নতুনকরে অন্তত আটটি ঘাঁটির নির্মাণ কাজ শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী, যার মধ্যে একটির নির্মাণ কাজ এখনও সচল রয়েছে। এই সামরিক অবস্থানগুলোর বিস্তৃতি মূলত গাজার মোট ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশ এলাকা জুড়ে, যাকে ইসরায়েলি সামরিক পরিভাষায় ‘ইয়েলো লাইন’ বা বাফার জোন বলা হচ্ছে। সম্প্রতি এক সম্মেলনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে দখলের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, আমরা বর্তমানে হামাসকে চেপে ধরেছি এবং গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অনুষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ গাজা অন্তর্ভুক্তির দাবি উঠলে তিনি ধাপে ধাপে এগোনোর কথা উল্লেখ করে আপাতত ৭০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার কথা জানান।
স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, ইসরায়েল কোনো অস্থায়ী পর্যবেক্ষণ চৌকি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে গাজা অবরুদ্ধ রাখার লক্ষ্যেই এই স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে তুলছে। নতুন তৈরি করা ঘাঁটিগুলোর মধ্যে দুটি উত্তর গাজায়, দুটি মধ্য অঞ্চলে, একটি নেৎসারিম করিডোরের পূর্বে এবং তিনটি দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরে অবস্থিত। সবচেয়ে বিতর্কিত পদক্ষেপ হিসেবে খান ইউনিসের প্রাচীন ‘ইস্টার্ন সেমেটারি’ বা কবরস্থান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে তার ওপর একটি নতুন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই নির্মাণ কাজ ২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এসে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটিতে রূপ নেয়, যেখানে সাঁজোয়া যান পার্কিং এবং সেনা আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়াতেও, যা গত বছরের অক্টোবরে সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকলেও বর্তমানে সেখানে সুরক্ষিত সামরিক স্থাপনা দৃশ্যমান।
এই সামরিক ঘাঁটিগুলো মাটির প্রাচীর, গভীর পরিখা এবং অভ্যন্তরীণ সেনাপথের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত, যা গাজার ফিলিস্তিনি জনবসতিগুলোকে চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর সামরিক বেষ্টনীর কারণে বেসামরিক নাগরিকদের চলাচল এবং নিজেদের কৃষিজমিতে প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২১ দফার ভিত্তিতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, ইসরায়েলের এই স্থায়ী সামরিক অবস্থান তার স্পষ্ট লঙ্ঘন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গত সাত মাসে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৯২৯ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
টিএইচএ/
