একজীবনে আল্লামা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী রহ.কে পেয়েছিলাম বলে আজ দো-চার অক্ষর লিখছি। খাঁটি বাংলায় বললে-একজন ইসহাক ফরিদী রহ.ই আমাদের জীবনে রঙ লাগানো লেখালেখির আসল কারিগর। তিনি তার চোখের দ্যোতি দিয়ে আমাদের কাছে ডাকতেন। কেবল মুখেই কথা বলতেন না। চোখের ভাষা ছিল অনন্য। চোখের ভাষায় তিনি ধমক দিতেন, কাছে টানতেন, ভালোবাসতেন। শিক্ষার্থীদের মনে এসবের দারুণ অনুভূতি আছে।
আজ আমার প্রথম গল্পের বই আর ইসহাক ফরিদী রহ.-এর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কথা বলতে চাইছি। আমার বন্ধু তাহসিন আমিনের কথা মনে পড়ছে। শীলন বাংলাদেশ-এর জাতীয় পর্যায়ের একটি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম আমরা। কুইজ ছেড়েছিলাম। ঢাকাব্যাপী ক্যাম্পেইন করে সাহিত্য সংগঠনের ব্যানারে আমরা এ আয়োজন করেছিলাম। ছাত্র অবস্থায় এটা অনেক কঠিন ছিল। তখন আমার গল্পের বই রাতুলের রংধনু গোলাপকুঁড়ি প্রকাশন থেকে মুনতাসির আলী ভাই প্রকাশ করেছিলেন। অবশ্য কবি মঈন মুরসালিন ভাইয়ের সহযোগিতা ছিল। তখন আমরা অনেকেই মাসিক গোলাপকুঁড়িতে লিখতাম।
তাহসিন বইটিকে আলোর মুখ দেখাতে অনেক সহযোগিতা করেছিলেন। মুনতাসির ভাইয়ের প্রেসেই বইটি ছাপা হয়েছিল। কবি মহিউদ্দিন আকবর ভাই ভেতরের ইলাস্টেশনের কাজটা করেছিলেন। তখন আমি রাজধানীর চৌধুরীপাড়া মাদরাসায় পড়ছি।
বইটি ছেপে আসার পর ভাবলাম, আমাদের সেরেতাজ আল্লামা ইসহাক ফরিদী রহ.-এর কাছে পৌঁছাতে হবে। সাহস পাচ্ছিলাম না।
হুজুরের অফিস কক্ষ খালি আছে কিনা বার বার দেখছি। কারণ, হুজুরের চেয়েও অন্যদের ভয় বেশি। কারণ, লেখালেখিটা হুজুরের মতো ভালো চোখে সবাই দেখেন না। নিজের লেখালেখির বিষয়টা অন্যদের জানাতেও চাই না। যাক, একবার দুইবার চেষ্টার পর বইহাতে প্রবেশ করলাম হযরতের হুজরায়।
ইসহাক ফরিদী রহ. চেয়ারে বসতেন না। নিচে আসন দিয়ে বসে লেখালেখি করতেন। চতুর্দিকে বই ছড়ানো ছিল। হুজুর লিখছিলেন, কেউ কক্ষে প্রবেশ করেছে-বুঝতে পেয়ে মাথা তুললেন? বললেন, কিছু বলবা?
:জী হুজুর।
: কী?
আমি সরাসরি বইটা বাড়িয়ে দিলাম। তিনি একবার আমার বইয়ের দিকে আরেকবার আমার দিকে তাকাতে লাগলেন। কী বিস্ময়! এ বয়সে হুজুেরের ছাত্র বই লিখে ফেলেছে! হুজুর বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। আমি অবাক বিস্ময়ে হুজুরের ভালোবাসার দৃষ্টি পরখ করতে লাগলাম। কোনো ধমক দিলেন না। ভয় দেখালেন না। পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করে ভড়কে দিতে চাইলেন না। হুজুর বইটি হাতে বার বার উল্টাতে লাগলেন। পড়তে শুরু করলেন।
কিছুক্ষণ নিবিড়ভাবে পড়লেন। কী লিখেছি, ভাষা, বানান, শব্দচয়ন দেখলেন। নিজের সন্তুষ্টির কথা প্রকাশ করলেন। গল্পের একটা জায়গায় আমার প্রিয় উস্তাদ আল্লামা আব্দুর রাজ্জাক আল হুসাইনী (দামাত বারাকাতুহুম) এর নাম উল্লেখ ছিল।
হুজুরের নাম পেয়ে তিনি অট্টহাসিতে যেনো পরিবশটা মোখর করে তুললেন। আমিও হাসছি। তিনি বললেন, যাও, তাড়াতাড়ি যাও। আল্লামা সাহেবকে ডেকে নিয়ে আসো। প্রসঙ্গত, চৌধুরীপাড়া মাদরাসার ইতিহাসে আল্লামা সাহেব একজনই ছিলেন। রংপুরের এই হুজুরকে সব্বাই আল্লামা হিসেবে জানতো। কিছুক্ষণের মধ্যেই হুজুর এসে হাজির। যখন হুজুরের কক্ষে আল্লামা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী রহ., আল্লামা আসআদ আল হুসাইনী (দামাত বারাকাতুহুম) ও আল্লামা আব্দুর রাজ্জাক আল হুসাইনী (দামাত বারাকাতুহুম) একত্র হতেন- তখন মনে এ কক্ষে আর কোনো দুঃখ নেই। হজরতদের মনে রাজ্যের সুখ যেনো নেমে আসতো। চলতো ইলমি সব আলোচনা।
আল্লামা আব্দুর রাজ্জাক আল হুসাইনী (দামাত বারাকাতুহুম) হুজুরকে দেখেই ইসহাক ফরিদী রহ. বললেন, মাওলানা! আপনার নামতো ইতিহাসে চলে এসেছে? আপনি তো ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন?
আল্লামা আব্দুর রাজ্জাক আল হুসাইনী (দামাত বারাকাতুহুম) কিছু বুঝতে পারছিলেন না। হাসছিলেন। ইসহাক ফরিদী রহ.বইটা দেখালেন। দেখালেন নির্ধারিত পৃষ্ঠ খোলে। তিনিও হাসতে হাসতে শেষ। চিরচেনা মুখে হাত দিয়ে কী যে হাসি। আর এ হাসিটা দেখবার জন্যই ইসহাক ফরিদী রহ. হুজুরকে কাছে ডেকে নিয়ে এলেন। আল্লামা সাহেব হুজুর হাসতে হাসতে কথাই বলতে পারছিলেন না।
এমন কত আদর পেয়েছি প্রিয় উস্তাদ আল্লামা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী রহ.-এর কাছে থেকে। আজকের এ দিনে আমার উস্তাদ কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনায় শাহাদাত লাভ করেন। মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে আরজ করছি, আল্লাহ মহান যেনো আমার উস্তাদকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করেন।
আল্লামা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী (৫ জুন ১৯৫৭ — ৫ জুন ২০০৫)
লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক
