রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা কোথায়

মাওলানা মামুনুল হক

by Masudul Kadir

আজ ১৭ জুন। মিসরের ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর দিন। ২০১৯ সালের এই দিনে মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মাদ মুরসি আদালতের কাঠগড়ায় মৃত্যুবরণ করেন।

২০১১ সালের আরব বসন্তের গণআন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের শাসক হোসনি মুবারকের পতন ঘটে। এরপর মিসরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড-সমর্থিত রাজনৈতিক সংগঠন ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির প্রার্থী ড. মুহাম্মাদ মুরসি জনগণের ভোটে বিজয়ী হন। তিনি প্রায় ৫১.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে মিসরের প্রথম বেসামরিক ও নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন।
কিন্তু এক বছরের মাথায় ২০১৩ সালে ব্যাপক বিক্ষোভের পর সেনাবাহিনী প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং তাকে আটক করা হয়।

বিজ্ঞাপন
banner

মুরসির অপসারণের পর মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন অভিযান শুরু হয়। ২০১৩ সালের আগস্টে কায়রোর রাবা আল-আদাবিয়া ও নাহদা স্কয়ারে মুরসি সমর্থকদের অবস্থান কর্মসূচি সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী বলপ্রয়োগে ছত্রভঙ্গ করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)-এর নিবিড় তদন্ত অনুযায়ী, শুধুমাত্র রাবা স্কয়ারেই এক দিনে অন্তত ৮১৭ জন বিক্ষোভকারীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়, যদিও প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়েছিল বলে তাদের ধারণা। একই দিনে নাহদা স্কয়ারে প্রাণ হারান আরও ৮৭ জন। অন্যদিকে, মুসলিম ব্রাদারহুডের দাবি ছিল এই সংখ্যা প্রায় ২,৬০০; যদিও মিসরের তৎকালীন সরকারি হিসাবে মাত্র ৬৩৮ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করা হয়েছিল। আধুনিক মিসরের ইতিহাসে এটি অন্যতম ভয়াবহ ও বর্বরতম গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই মূল হত্যাকাণ্ডের আগেও ক্ষমতাচ্যুতির প্রতিবাদে মুখর মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনী কয়েক দফায় রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন চালায়। জুলাই মাসের শুরুতে রিপাবলিকান গার্ডস সদর দফতরের সামনে নামাজরত অবস্থায় গুলি চালিয়ে ৬১ জনকে এবং জুলাইয়ের শেষের দিকে মানাসসা স্মৃতিসৌধের পাশে মিছিলে ৯৫ জনকে হত্যা করা হয়। এমনকি রাবা গণহত্যার দুদিন পর ১৬ আগস্ট রামসেস স্কয়ারে ক্ষুব্ধ জনতার ওপর গুলিবর্ষণে আরও ১২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের চূড়ান্ত হিসাব মতে, ২০১৩ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের এই সংক্ষিপ্ত সময়ে মিসরীয় নিরাপত্তা বাহিনীর পদ্ধতিগত গুলিবর্ষণে সামগ্রিকভাবে কমপক্ষে ১,১৫০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হন, যা আন্তর্জাতিক আইনে সরাসরি “মানবতাবিরোধী অপরাধ” হিসেবে গণ্য।

এরপর হাজার হাজার মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থক, রাজনৈতিক কর্মী ও বিরোধী কণ্ঠকে গ্রেফতার করা হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী বছরগুলোতে প্রায় ৬০,০০০ (ষাট হাজার) মানুষকে রাজনৈতিক কারণে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বহুজনের বিরুদ্ধে প্রহসনমূলক মামলা হয়, অনেককে দীর্ঘমেয়াদি সাজা দেওয়া হয় এবং একযোগে শত শত বন্দিকে গণ-মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
মুরসির বিরুদ্ধেও এমন একাধিক রাজনৈতিক মামলা চলতে থাকে। ২০১৯ সালের ১৭ জুন আদালতে শুনানির সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিনের নির্জন কারাবাস, চিকিৎসার চরম সীমাবদ্ধতা এবং পদ্ধতিগত অবহেলার কারণেই মূলত কাঠগড়াতেই তাঁর জীবনের অবসান ঘটে।

মুরসির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, কোনো দেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বিরোধী হলে তা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে পশ্চিমা শক্তির ইন্ধন আজকে প্রমাণিত সত্য। যারা সারাবিশ্বে গণতন্ত্রের ফেরি করে বেড়ায় তারাই একজন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত শাসককে উৎখাত করে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে, কারণ তিনি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন চাইতেন।

মুহাম্মাদ মুরসির শাহাদাত এবং এই বিপুল সংখ্যক মানুষের আত্মত্যাগ সেই প্রশ্ন খুব জোরালোভাবে সামনে আনে—
রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা কোথায়?
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইসলামী খেলাফত মজলিস

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222