৩৬ নিউজ ডেস্ক:: গত পাঁচ দশকে আধুনিক ফুটবলের গতি যেমন রকেট গতিতে বেড়েছে, তেমনি অবিশ্বাস্য পরিবর্তন এসেছে মাঠের তারকাদের শারীরিক গঠনেও। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে ব্রাজিলের কার্লোস আলবার্তোর সেই ঐতিহাসিক দলগত গোলটির কথা ফুটবলপ্রেমীদের আজীবন মনে থাকবে। আটজন খেলোয়াড়ের পা ছুঁয়ে ৩০ সেকেন্ডের এক নান্দনিক ছন্দে গোলটি করেছিল সেদিনের ব্রাজিল। কিন্তু ঠিক ৫২ বছর পর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার গোলটি ছিল প্রায় একই রকম দলগত প্রচেষ্টার ফসল, যা সম্পন্ন করতে লিওনেল মেসিদের সময় লেগেছিল মাত্র ১২ সেকেন্ড। ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান যুগের তীব্র গতি আর নিখুঁত ট্যাকটিক্সের সামনে ১৯৭০ সালের ব্রাজিলের সেই ধীরগতির আক্রমণ হয়তো শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ত। আর এই পার্থক্যের মূল কারণ প্রতিভা নয় বরং ফুটবলারদের শরীরের ভেতরের শারীরবৃত্তীয় (ফিজিওলজিক্যাল) পরিবর্তন।
যুক্তরাজ্যের উলভারহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দীর্ঘ মেয়াদী এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৫০ বছরে শীর্ষ সারির ফুটবলাররা আগের চেয়ে অনেক বেশি লম্বা এবং ছিপছিপে বা মেদহীন হয়েছেন। ১৯৭৩ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের খেলোয়াড়দের গড় উচ্চতা বেড়েছে ৪ সেন্টিমিটারের বেশি। আশির দশকে ফুটবলারদের পেশিবহুল ও ভারী শরীরের কদর ছিল বেশি, কারণ শীতকালে কাদামাখা ভারী মাঠে খেলার জন্য শক্তির প্রয়োজন হতো। কিন্তু বর্তমান আধুনিক হাইব্রিড ও উন্নত মানের পিচে খেলার জন্য খেলোয়াড়দের শরীর হয়ে উঠেছে দীর্ঘাঙ্গী, হালকা এবং দীর্ঘ হাড়ের অধিকারী। এই নতুন শারীরিক গঠনের ফলে খেলোয়াড়রা কম শক্তি অপচয় করে দীর্ঘ সময় ধরে মাঠে একই গতিতে পারফর্ম করতে পারেন।
গতি এবং দৌড়ের ধরনের ক্ষেত্রেও এসেছে এক আমূল পরিবর্তন। গত শতাব্দীর শেষভাগেও ফুটবলারদের মাঠে ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার গতিতে দৌড়ানো যেখানে বিরল ছিল, সেখানে ২০২২ বিশ্বকাপে অন্তত ১০ জন খেলোয়াড় ঘণ্টায় ৩৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ছুটেছেন। শুধু একবার দ্রুত দৌড়ানোই শেষ কথা নয়, আধুনিক ফুটবলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ম্যাচজুড়ে বারবার এমন তীব্র গতিতে দৌড়ানোর দেওয়ার ক্ষমতা। ইউরো ২০২৪-এর পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ম্যাচে একজন ফুল-ব্যাক গড়ে ১৪ বার এবং একজন ফরোয়ার্ড ১২ বার ২৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে স্প্রিন্ট কাটেন। গত শতাব্দীতে একজন স্ট্রাইকার মাঠের অধিকাংশ সময় হেঁটে কাটিয়ে কেবল গোল করার মুহূর্তে জ্বলে উঠতে পারতেন কিন্তু বর্তমানের হাই-প্রেসিং ফুটবলে সেই আয়েসের আর কোনো সুযোগ নেই। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ওপর অনবরত চাপ সৃষ্টি করতে ডিফেন্ডার থেকে শুরু করে ফরোয়ার্ড, সবাইকে অবিরত ছুটে বেড়াতে হচ্ছে।
তবে এই তীব্র গতি আর ঠাসা ম্যাচ সূচির বড় মাশুলও দিতে হচ্ছে খেলোয়াড়দের শরীরকে। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে শীর্ষ সারির ফুটবলারদের এখন বছরে ৬০ থেকে ৬৫টি পর্যন্ত ম্যাচ খেলতে হচ্ছে, যা তাঁদের চোটের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপীয় ফুটবলে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যার ৬০ শতাংশই ঘটে তীব্র গতিতে দৌড়ানোর সময়। পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং শরীরের চূড়ান্ত সীমার বাইরে গিয়ে পারফর্ম করার কারণে আধুনিক ফুটবলারদের শরীর প্রায়ই ভেঙে পড়ছে।
অবশ্য মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে স্পোর্টস সায়েন্স বা ক্রীড়া বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি। পুষ্টি, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং উন্নত রিকভারি পদ্ধতির কল্যাণে ফুটবলারদের দীর্ঘ ক্যারিয়ার বজায় রাখার পথও সুগম হয়েছে। এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের বয়সই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে যেখানে ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী খেলোয়াড় ছিলেন মাত্র সাতজন, সেখানে এবারের বিশ্বকাপে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ জনে, যার মধ্যে আটজন খেলোয়াড়ের বয়স ৪০ বছরের ওপরে। ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বা ৪৩ বছর বয়সী স্কটিশ গোলরক্ষক ক্রেগ গর্ডনরা প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে, সঠিক নিয়ম মেনে শরীরের যত্ন নিলে বর্তমান যুগের তীব্র গতির ফুটবলেও চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে এসেও দাপটের সাথে টিকে থাকা সম্ভব।
এনআর/
