আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংঘাত-জর্জরিত এলাকাগুলোতে যুব গ্যাং বা কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা বন্ধে অনন্য ভূমিকা রাখছেন স্থানীয় নারীরা। চিরাচরিত পুলিশি অভিযানের বদলে কাউন্সেলিং এবং তরুণদের মানসিকতা পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনছেন তারা। মাইদুগুরির আজিলারি এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুলহামিদ এমনই একজন, ২০২৩ সালে এক গ্যাং হামলায় যার ডান হাতের আঙুলগুলো হারিয়ে গেছে। একসময় নিজে সহিংসতায় লিপ্ত থাকলেও, আজিলারি ও জেরে এলাকার নারীদের উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এখন কিশোরদের এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরিয়ে আনার কাজ করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে মাইদুগুরির বিভিন্ন এলাকায় ‘মার্লিয়ান্স’ নামে পরিচিত স্থানীয় যুব গ্যাংগুলো ছুরি, কুড়াল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ২০২৩ সালে বোর্নো রাজ্যের গভর্নর বাবাগানা উমারা জুলুম এই গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানের নির্দেশ দিলেও কেবল পুলিশি তৎপরতায় অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা যাচ্ছিল না। বোকো হারাম বিদ্রোহীদের দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সহিংসতার কারণে এই অঞ্চলের যুবসমাজ মাদক ও অপরাধের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে ‘ইউনিফাইড মেম্বারস ফর উইমেন অ্যাডভান্সমেন্ট’ (ইউএমডব্লিউএ) নামক একটি নারী সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক হাসানা ইব্রাহিম ওয়াজিরি স্থানীয় নারীদের নিয়ে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তারা ১০টি স্পর্শকাতর এলাকার গ্যাং লিডারদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের আয়োজন করেন।
শাস্তির চেয়ে তরুণদের বোঝানো এবং তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার পথ দেখানোর এই কৌশলে অভাবনীয় সাড়া মেলে। নারীদের এই উদ্যোগে যুক্ত হয় ‘আজিলারি ক্রস ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’ এবং ‘গোমারি ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’ এর মতো তৃণমূল সংগঠনগুলো। স্থানীয় কমিউনিটি লিডার বুলামা বাবানিদা জানান, প্রশিক্ষিত স্থানীয় নারীরা প্রতি রবিবার এই গ্যাংগুলোর জন্য শান্তি সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা করছেন এবং কোনো বিরোধ তৈরি হলে তা সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই সমাধান করছেন। গোমারি ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নারী নেত্রী ফাতিমা তাহির জানান, শুরুতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকে বাধা এলেও নারীদের হাত ধরে সংঘাত কমে আসায় এখন সবাই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন।
স্থানীয় নেতাদের মতে, এই সংলাপের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১ হাজারেরও বেশি গ্যাং সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। নারীরা নীরবে মাদকপ্রবণ এলাকাগুলোর ওপর নজর রাখছেন এবং যেকোনো উত্তেজনার খবর পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে আগেভাগেই জানিয়ে দিচ্ছেন। তবে এই অর্জন ধরে রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সাবেক গ্যাং সদস্যরা প্রায়ই পুরোনো শত্রুদের প্রতিশোধের হুমকিতে থাকেন এবং তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য সরকারি কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো নেই। এছাড়া আন্তর্জাতিক তহবিল কমে যাওয়ায় নারীদের এই শান্তি উদ্যোগগুলো টিকিয়ে রাখতে নিজেদের পকেট থেকে অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। তবুও হাসানা ইব্রাহিম ওয়াজিরির মতো শান্তিকর্মীরা বিশ্বাস করেন, ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে এই তরুণদের মনে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব, যার সুফল ভোগ করবে গোটা সমাজ।
তথসূত্র: আল জাজিরা
টিএইচএ/
