স্কুল-আলিয়ার নিয়মতান্ত্রিকতা বনাম কওমীর বাস্তবতা : স্কুল এবং আলিয়া মাদরাসার পাঠ্যক্রমের দিকে তাকালে একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চোখে পড়ে। সেখানে একটি বই প্রণয়নে সাত-আটজন বিষয়-বিশেষজ্ঞ লেখক ও গবেষক যুক্ত থাকেন। শিক্ষার্থীর বয়স, স্থান-কাল-পাত্র এবং মনস্তত্ত্ব বিবেচনা করে তবেই বইগুলো তৈরি হয়। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষকরা কীভাবে পড়াবেন, তার জন্য পৃথক ‘শিক্ষক নির্দেশিকা’ বই থাকে। শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে সিলেবাস অনুযায়ী পাঠদানে অভ্যস্ত করা হয়। এমনকি বইয়ের ভাষা, অলংকরণ এবং রঙের ব্যবহারে শিক্ষার্থীর বয়সকে প্রাধান্য দিয়ে ফোর-কালারে আকর্ষণীয়ভাবে তা ছাপা হয়।
কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের কওমি মাদরাসার পাঠ্যক্রম ও ‘মানহাজ’ (পদ্ধতি) পর্যালোচনা করলে এক ভিন্ন চিত্র ভেসে ওঠে। এখানে অনেক সময় দেখা যায়, একজন লেখক একাই সব বিষয়ের বই বা কিতাব রচনা করে চলেছেন! মাক্কী, মাদানী কিংবা বোগদাদী সিলেবাসের নামে যেন এক ব্যক্তির একক সাম্রাজ্য। কিতাবগুলোর ভাষাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেশ জটিল ও কুটিল। মূল কিতাবের ওপর ‘শরহ দর শরহ’ (টীকা-ভাষ্য) পড়তে পড়তে শিক্ষার্থীদের প্রাণান্তকর অবস্থা হয়। বিশেষ করে দরসি কিতাবের ভেতরের ‘হাশিয়া’ (টীকা) পড়তে গিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের চোখের পাওয়ার নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়। পুরনো আমলের খতে (লিপি) রচিত সেই কিতাবগুলোর ছোট ছোট হরফ পড়তে পাওয়ারফুল চশমা ব্যবহার করা এখন কওমি শিক্ষার্থীদের সাধারণ নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিলেবাস কমিটি ও যোগ্যতার মূল্যায়ন : আমাদের সিলেবাস কমিটিগুলোর গঠনপ্রক্রিয়াও এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন। কমিটিতে মাদরাসার মুহতামিম বা ‘বড় হুজুর’দের রাখাটা যেন এক অলিখিত বাধ্যতামূলক নিয়ম। ‘আম কমিটি’র পর আবার তৈরি হয় ‘খাস কমিটি’! কিন্তু দুঃখজনক হলো, এই কমিটিগুলোতে প্রকৃত বিষয়-বিশেষজ্ঞ আলেমদের উপস্থিতি থাকে একেবারেই নগণ্য।
একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। মাওলানা লিয়াকত আলী, ডক্টর আ ফ ম খালিদ হোসেন, মাওলানা ডক্টর শামসুল হক সিদ্দীক, মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী, মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ, মাওলানা যাইনুল আবেদীন, মাওলানা নাসীম আরাফাত, মুফতী ডক্টর মুহম্মদ গোলাম রব্বানী কিংবা হাফেয ডক্টর মুহাম্মদ তারেকের মতো জাতীয় স্তরের কওমি তারকা ও প্রাজ্ঞ গবেষকদের কি আমাদের সিলেবাস কমিটিতে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়?
প্রশ্ন জাগে আজও কেন লাখ লাখ তালেবে ইলমের উপযোগী একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী ‘মানহাজ’ মুকাররারাত বা পাঠ্যক্রম তৈরি করতে পারল না আমাদের কওমি ঘরানার শিক্ষাবোর্ডগুলো?
বোর্ডের দায়িত্বশীলদের এখন আরও বেশি উদার, দূরদর্শী এবং সময়ের প্রয়োজনে অপরকে মূল্যায়ন করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। বাস্তবতা হলো, সবাই মাদরাসার মুহতামিম হবেন না বা হওয়ার প্রয়োজনও নেই। প্রাতিষ্ঠানিক কমিটির বাইরে থেকেও যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ আলেমদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘সিলেবাস প্রণয়ন সাব-কমিটি’ গঠন করা যায়, তবে এই সংকট দূর করা সম্ভব। কওমি অঙ্গনের মেধাবী তারকাদের মেধা ও যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন করা আজ সময়ের দাবি, যাতে কওমি মাদরাসা হয়ে ওঠে আরও শক্তিশালী ও সুদৃঢ় দীনি দুর্গ।
যুগ-চাহিদা ও আমাদের শিক্ষাবিদ সংকট : আমাদের কোনো কোনো শিক্ষা বোর্ডের বয়স ৫০ বছর, কোনোটির ৬০ বছর, আবার কোনোটির ১০০ বছরও পার হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত দীর্ঘ সময়েও কওমি মাদ্রাসার কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ তৈরিতে এই বোর্ডগুলোর কোনো ভূমিকা আছে কি না, তা আমার জানা নেই। আমাদের দেশে গ্রামে গ্রামে ‘জামেয়া’ বা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে, এমনকি এসব বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে আলাদা বোর্ডও রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার ‘শিক্ষা বিশেষজ্ঞ’ বা ‘শিক্ষা গবেষক’ কারা?—এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর মেলা ভার।
যুগ যুগ ধরে এভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট গবেষণা ছাড়াই যে যার মতো বই বা কিতাব পড়িয়ে যাবে, তা হতে পারে না। যুগের চাহিদা উপলব্ধি না করে কেবল পুরনো ধ্যান-ধারণার লোক তৈরি করলে কওমি মাদ্রাসাগুলো আধুনিক সমাজ থেকে ছিটকে পড়বে। যারা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার গভীর চর্চা বাদ দিয়ে কেবল ‘হক ও বাতিল’ এর সস্তা আবেগ নিয়ে অর্থহীন কাদা-ছোড়াছুড়ি বা বাহাসে লিপ্ত থাকে, তারা হয়তো মনে করে আমরাই সত্যের একমাত্র ধারক। কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ আমাদের আত্মোপলব্ধির প্রয়োজন রয়েছে।
নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনায় উপযোগিতার অভাব : একটি রূঢ় বাস্তবতার দিকে চোখ ফেরানো যাক। আমাদের জনপ্রতিনিধিত্ব কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কোনো বিভাগেই কওমি গ্র্যাজুয়েটরা আজ উপযোগী হয়ে উঠতে পারছে না। কেন পারছে না? অন্যদিকে, আমাদের দেশের পশ্চিমা ঘরানার শিক্ষাব্যবস্থা এবং সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখান থেকে এমন সব ব্যক্তিত্ব তৈরি হচ্ছে যারা সফলভাবে দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং রাষ্ট্র চালাচ্ছে। তাহলে আমাদের কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস জাতিকে কী উপহার দিচ্ছে?
প্রতি বছর জাতীয়ভাবে শিক্ষার বিশাল বাজেট প্রণয়ন করা হয়। সবার জন্য সমান শিক্ষা অধিকার ও আর্থিক বরাদ্দ থাকলেও কেবল বঞ্চিত থাকে কওমি মাদ্রাসা। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা গবেষণা বা মানোন্নয়নের জন্য কোনো বাজেট বা তহবিল আছে কি না, তাও আমাদের জানা নেই। তবে এই প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে কেউ কাউকে সহজে জায়গা ছেড়ে দেয় না, নিজের অধিকার এবং অবস্থান লড়াই করে আদায় করে নিতে হয়।
হতাশা, ব্রেন ড্রেন এবং সংস্কারের অপরিহার্য দাবি : কওমি মাদ্রাসায় যারা গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছেন এবং প্রাজ্ঞ আলেম হিসেবে গড়ে উঠছেন, তারা শিক্ষা সমাপন (ফারেগ) করার পর যখন চারদিকে তীব্র ক্যারিয়ার সংকট ও হতাশা দেখেন, তখন অনেকেই বাধ্য হয়ে ভিন্ন পথ বেছে নিচ্ছেন। মাদ্রাসার নীতিনির্ধারক কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষা বোর্ডের দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের এই বিষয়টি নিয়ে আরও সচেতন ও দূরদর্শী হতে হবে। সময়কে উপলব্ধি করে তারা যদি এমন একটি পাঠ্যক্রম ও সিলেবাস উপহার দিতে না পারেন যা দেশ ও জাতির নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী, তবে এর জন্য আল্লাহর কাছে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
দিন দিন কওমি মাদ্রাসার মেধাবী শিক্ষার্থীরা এ অঙ্গন ছেড়ে অন্য পেশা বা পথে চলে যাচ্ছে। এই মেধা পাচার বা ‘ব্রেন ড্রেন’ যদি রুখতে হয়, তবে কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস পুনর্বিবেচনা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার করার কোনো বিকল্প নেই। সময়ের দাবি মেনে কওমি শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে একে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে, কওমি মাদ্রাসা ধীরে ধীরে সমাজের বুকে তার প্রাসঙ্গিকতা ও আবেদন হারিয়ে ফেলবে।
সময়ের স্পন্দনকে উপলব্ধি করেই কওমি মাদরাসাকে আগামীর পথে এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমান যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের পাঠ্যতালিকায় গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, প্রয়োজনীয় সাধারণ জ্ঞান, মৌলিক বিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং লোকপ্রশাসনের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা এখন অপরিহার্য। তবে সতর্ক থাকতে হবে, এসব আধুনিক বিষয়ের বইও যেন আবার কোনো একক ব্যক্তি নিজের খেয়ালখুশিমতো লিখে না বসেন! এর জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পারদর্শী আলেম ও বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে, দেশজুড়ে গড়ে ওঠা লাখ লাখ মহিলা বা বালিকা মাদরাসার সিলেবাস ও পাঠ্যক্রম নিয়েও আমাদের নতুন করে ও গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। তাদের মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক উপযোগিতার বিষয়টিও যেন আমরা এড়িয়ে না যাই। আশা করি, নীতিনির্ধারকেরা এই নীরব সংকটগুলো অনুধাবন করবেন এবং একটি সুন্দর ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দিকে পা বাড়াবেন।
লেখক: পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট।
