চিফ রিপোর্টার:: পশ্চিমা শক্তির প্রস্থান এবং মার্কিন সমর্থিত সরকারের পতনের পর আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তালেবান প্রশাসনের সফল পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। শনিবার রাজধানী কাবুলে সাবেক মার্কিন দূতাবাসের বাইরে সাঁজোয়া যান, বিভিন্ন ব্যানার ও জাতীয় পতাকাসহ এক ঐতিহাসিক ও বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করে তালেবান সরকার।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অঙ্গনেও তালেবান সরকারের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্র ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সাথে কৌশলগত অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে প্রশাসন। পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে তালেবান সরকার।
পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে এই দিনটিকে ‘বিজয়ের দিন’ হিসেবে ঘোষণা করে তালেবান প্রশাসন পুরো দেশে তাদের সুদৃঢ় শাসন ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের চিত্র তুলে ধরেছে। এক ভিডিও বার্তায় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হক্কানি জানান, আফগান জনগণের সাহস, অদম্য মনোবল এবং ঐশ্বরিক সহায়তার ফলেই এই ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। একই সাথে দেশের সার্বিক উন্নয়নে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অঙ্গনেও তালেবান সরকারের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্র ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সাথে কৌশলগত অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে প্রশাসন। পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে তালেবান সরকার।

তালেবান সরকারের ক্ষমতায় ফেরার পঞ্চম বার্ষিকীর প্রাক্কালে, ২০২৬ সালের ১৪ই আগস্ট আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশে রাস্তার পাশের এক বিক্রেতার কাছ থেকে এক আফগান বালক একটি তালেবান পতাকা কিনছে। ছবি: এএফপি
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-বক্তা জিয়া আহমদ তাকাল জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আফগান মিশনগুলোতেও সরকারের পাঁচ বছর পূর্তি উৎসব উদ্দীপনার সাথে উদযাপিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং চীন, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, ইরান, তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার মতো আঞ্চলিক পরাশক্তি ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মেলবন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়েছে।

বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতা সত্ত্বে গত পাঁচ বছরে তালেবান সরকার আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, শাসনব্যবস্থা সুসংগঠিত করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক পথ সুগম করার মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।
পাঁচ বছরে তালেবান সরকারের উল্লেখযোগ ও ঐতিহাসিক অর্জনসমূহ
মাদক মুক্তকরণে বৈশ্বিক রেকর্ড: তালেবান সরকারের সবচেয়ে প্রশংসিত সাফল্য হলো আফিম উৎপাদন ও পপি চাষের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা। ২০২২ সালে আমিরুল মুমিনিনের ডিক্রি জারির পর আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএনওডিসি (UNODC)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে আফিম উৎপাদন প্রায় ৯৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আধুনিক ইতিহাসে অবৈধ মাদক ব্যবসা নির্মূলে এটিকে সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও রাজস্ব বৃদ্ধি: বিদেশি সাহায্য ও আটকে রাখা রিজার্ভের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তালেবান সরকার নিজস্ব অর্থনৈতিক সংস্কার চালু করেছে। কার্যকর শুল্ক ব্যবস্থা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আদায় রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিদেশি সাহায্য ছাড়াই সরকারি ব্যয় পরিচালনায় সক্ষমতা এনেছে।

প্রাকৃতিক সম্পদ ও মেগা অবকাঠামো উন্নয়ন: দেশের তেল, তামা এবং লিথিয়াম খাতকে উন্মুক্ত করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা হয়েছে। উত্তর আফগানিস্তানের ঐতিহাসিক ‘কুশ টেপা খাল’ (Qosh Tepa Canal) মেগা সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কৃষি খাতে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করা হয়েছে, যা দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখছে।
সার্বিক নিরাপত্তা ও একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা: চার দশকের যুদ্ধ ও অস্থিরতার পর প্রথমবারের মতো সমগ্র আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে এক একক ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে তালেবান সরকার। দেশের অভ্যন্তরীণ জাতীয় সড়কসমূহ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন সাধারণ নাগরিকদের জন্য নিরাপদ করা হয়েছে।

কূটনৈতিক সংযোগ ও আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব: বিশ্বমঞ্চে একঘরে করার পশ্চিমা চেষ্টা সত্ত্বেও তালেবান প্রশাসন নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান শক্ত করেছে। রাশিয়া তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে এবং চীন কাবুলে স্থায়ী রাষ্ট্রদূত নিয়োগের পাশাপাশি বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এছাড়া পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, ইরান, তুরস্ক এবং মালয়েশিয়ায় তালেবান সরকারের আন্তর্জাতিক অফিস ও মিশনগুলোর মাধ্যমে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে তালেবান সরকার নিজেদের প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুসংহত করার মাধ্যমে এক আত্মনির্ভরশীল আফগানিস্তানের নতুন ভিত্তি স্থাপন করেছে।
