ঈমানী গণজাগরণের মহানায়ক আল্লামা শফীর ইন্তেকালের ছয় বছর

by hsnalmahmud@gmail.com

২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল। রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সমবেত হয়েছিলেন আলেম-উলামা, মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও তৌহিদি জনতা। ইসলাম ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননার প্রতিবাদ এবং ১৩ দফা দাবি আদায়ে আয়োজিত সেই গণসমাবেশের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.।

এই আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল আরও আগে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি সরকার ও দেশবাসীর উদ্দেশে ঐতিহাসিক খোলা চিঠি প্রকাশ করেন তিনি। এরপর তাঁর আহ্বানে ৯ মার্চ হাটহাজারীতে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলন। চূড়ান্ত হয় ১৩ দফা দাবি এবং ঘোষণা করা হয় ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ।

বিজ্ঞাপন
banner

তাঁর নেতৃত্বে সংগঠিত আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আসে ৬ এপ্রিলের গণসমাবেশ ও ৫ মে ঢাকা অবরোধ। পরদিন শাপলা চত্বরে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আন্দোলনকারীদের হত্যার ঘটনা ঘটে।

তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমীর এবং দেশের আলেমসমাজের শীর্ষস্থানীয় মুরব্বী আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.।

আজ ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁর ইন্তেকালের ছয় বছর পূর্ণ হলো। ২০২০ সালের এই দিনে রাজধানীর আসগর আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন তিনি।

ইলমের পথে

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার পাখিয়ারটিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.। স্থানীয় মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি পটিয়ার জিরি মাদরাসা ও আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে পড়াশোনা করেন।

উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের জন্য পরে যান ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে। সেখানে উপমহাদেশের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শাইখুল ইসলাম আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর কাছে ইলম অর্জন করেন। তাঁর সাহচর্যে আধ্যাত্মিক পথনির্দেশনা লাভ করেন এবং খেলাফত অর্জন করেন।

দেশে ফিরে হাটহাজারী মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। দীর্ঘদিন হাদিসের দরস প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির শায়খুল হাদিস ও মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৬ সালে তিনি হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম হন। প্রায় ৩৪ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর কাছে শিক্ষাগ্রহণ করা ছাত্রদের অনেকে পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন মাদরাসায় শিক্ষকতা, হাদিসের দরস ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যুক্ত হন। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘বড় হুজুর’ নামে।

শিক্ষকতা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি গ্রন্থ রচনাতেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফয়জুল জারী’, ‘হক ও বাতিলের চিরন্তন দ্বন্দ্ব’ এবং ‘ইসলামী অর্থব্যবস্থা’।

দীর্ঘ ইলমী খেদমত ও মাদরাসা পরিচালনার মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে হেফাজতের নেতৃত্বে আসার বহু আগেই আলেমসমাজে তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে।

হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠা

২০১০ সালে আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

তৎকালীন শিক্ষানীতি, নারী উন্নয়ননীতি এবং ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের উদ্যোগের বিরুদ্ধে আলেমসমাজের প্রতিবাদের প্রেক্ষাপটে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে।

ইসলামী শিক্ষা, ঈমান-আকিদা ও ধর্মীয় অধিকারসংক্রান্ত দাবি নিয়ে আলেম-উলামাকে সংগঠিত করার মঞ্চ হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে হেফাজত।

আল্লামা শফী রহ. প্রতিষ্ঠাতা আমীরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মহাসচিব হন তাঁর ছাত্র আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী রহ.।

হাটহাজারী ও চট্টগ্রামের আলেমসমাজকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংগঠনটির কার্যক্রম ক্রমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। বিভিন্ন মাদরাসা ও ইসলামী সংগঠনের আলেমরা এর সঙ্গে যুক্ত হন।

২০১৩ সালে শাহবাগবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হেফাজতে ইসলাম জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

২০১৩: শাহবাগের বিরুদ্ধে অবস্থান

২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধের মামলায় আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের পর তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে আন্দোলন শুরু হয়। ব্লগার ও অনলাইন আন্দোলনকারীদের উদ্যোগে শুরু হওয়া কর্মসূচিটি পরে গণজাগরণ মঞ্চের রূপ নেয়।

আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্লগারের বিরুদ্ধে ইসলাম ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবমাননা করে লেখালেখি এবং ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালানোর অভিযোগ সামনে আসে।

১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার নিহত হন। এরপর তাঁর লেখকত্ব দাবি করে সংবাদপত্রে প্রকাশিত ইসলাম অবমাননাকর লেখাগুলো ঘিরে প্রতিবাদ বিস্তৃত হয়।

শাহবাগের এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.।

ইসলামবিদ্বেষী প্রচারের প্রতিবাদে তিনি সরকারের কাছে ধর্ম অবমাননার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিকে সামনে রেখে ইসলাম ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে জানান তিনি।

একই সঙ্গে ঈমান-আকিদা ও ইসলামের মর্যাদা রক্ষায় দলীয় মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে আলেমসমাজ ও দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

এই অবস্থানের ধারাবাহিকতায় সরকার ও দেশবাসীর উদ্দেশে প্রকাশ করেন ঐতিহাসিক খোলা চিঠি।

ঐতিহাসিক খোলা চিঠি

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। দৈনিক আমার দেশসহ কয়েকটি জাতীয় সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয় আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর খোলা চিঠি।

শিরোনাম ছিল ‘শাহবাগে ইসলাম বিদ্বেষের প্রতিবাদে গর্জে উঠুন’।

চিঠিতে শাহবাগের ইসলামবিদ্বেষী তৎপরতার প্রতিবাদ জানিয়ে আল্লামা শফী রহ. বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিকে সামনে রেখে তরুণসমাজের আবেগ ব্যবহার করে একটি মহল ইসলামবিরোধী কার্যক্রম চালাচ্ছে।

আল্লাহ, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, পবিত্র কুরআন এবং দাড়ি-টুপি ও পর্দার মতো ইসলামের প্রতীকসমূহের অবমাননার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান তিনি। একই সঙ্গে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবির বিরোধিতা করেন।

সরকারের কাছে ইসলাম অবমাননার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, ইসলামের প্রতীকসমূহের অবমাননা ও দাড়ি-টুপিধারীদের ওপর হামলার বিচার এবং ধর্মীয় দাবিতে সভা-সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান আল্লামা শফী রহ.।

চিঠিতে তিনি দেশবাসীকে শাহবাগের কর্মকাণ্ডকে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার বিরোধ হিসেবে বিবেচনা না করে এর ধর্মীয় দিকটি অনুধাবনের আহ্বান জানান।

দলীয় মতপার্থক্য পেরিয়ে ঈমান-আকিদা ও ইসলামের মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

খোলা চিঠি প্রকাশের পর আলেমসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে দেশের শীর্ষ আলেম, পীর-মাশায়েখ ও ইসলামী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে জাতীয় সম্মেলনের উদ্যোগ নেন আল্লামা শফী রহ.।

জাতীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলন ও ১৩ দফা

৯ মার্চ ২০১৩। আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর আহ্বানে হাটহাজারী মাদরাসায় অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আলেম, পীর-মাশায়েখ, মাদরাসার পরিচালক, মসজিদের খতিব ও ইসলামী সংগঠনের নেতারা এতে অংশ নেন।

আল্লামা শফী রহ.-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে তাঁর লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ছেলে মাওলানা মুহাম্মাদ আনাস মাদানী।

বক্তব্যে তিনি ইসলাম ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননার বিরুদ্ধে আলেমসমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। বিভিন্ন সংগঠনের মতপার্থক্য পেরিয়ে সম্মিলিত কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে দাবি ও প্রস্তাবগুলোর খসড়া পাঠ করেন হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষক মুফতী জসীম উদ্দীন।

এরপর উপস্থিত আলেম ও ইসলামী সংগঠনের নেতারা দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতির অনুমোদনে চূড়ান্ত করা হয় হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি।

দাবিগুলোর মধ্যে ছিল সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন, ইসলাম ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়ন এবং ধর্ম অবমাননায় অভিযুক্ত ব্লগারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

ইসলামী শিক্ষা, ধর্মীয় কার্যক্রম ও সামাজিক নীতিসংক্রান্ত আরও কয়েকটি দাবি এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সম্মেলন থেকে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ছিল মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান।

সবশেষে ঘোষণা করা হয় ৬ এপ্রিল দেশের সব জেলা থেকে ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ।

সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে আল্লামা শফী রহ. আলেমসমাজের ঐক্য অক্ষুণ্ন রাখার আহ্বান জানান। তাঁর পরিচালনায় আখেরি মুনাজাতের মাধ্যমে সম্মেলন শেষ হয়।

এই সম্মেলনের মাধ্যমে ১৩ দফা দাবি চূড়ান্ত হয় এবং দেশব্যাপী আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারিত হয়।

৬ এপ্রিল: শাপলা চত্বরে গণসমাবেশ

৬ এপ্রিল ২০১৩।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর নেতৃত্বে ঘোষিত লংমার্চে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীতে আসেন আলেম-উলামা, মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও তৌহিদি জনতা।

পাল্টা হরতাল ও অবরোধের কারণে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতে বাধা তৈরি হলেও মতিঝিলের শাপলা চত্বর ও আশপাশের এলাকায় বিশাল জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.। তাঁর লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ছেলে মাওলানা মুহাম্মাদ আনাস মাদানী।

বক্তব্যে ইসলাম ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ১৩ দফা বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, হেফাজতের আন্দোলনের উদ্দেশ্য কাউকে ক্ষমতা থেকে সরানো কিংবা কাউকে ক্ষমতায় বসানো নয়। তবে ক্ষমতায় থাকতে কিংবা ক্ষমতায় যেতে হলে সংগঠনটির দাবি মেনে নিতে হবে।

সমাবেশ থেকে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী রহ.।

দাবি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। দাবি পূরণ না হলে ৫ মে ঢাকা অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়।

আল্লামা শফী রহ.-এর নেতৃত্বে সংগঠিত এই গণসমাবেশের মাধ্যমে ১৩ দফা আন্দোলন বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়।

৫ ও ৬ মে: শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড

১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর নেতৃত্বে ঘোষিত কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ৫ মে ঢাকা অবরোধ পালন করে হেফাজতে ইসলাম।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নেতাকর্মীরা রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে অবস্থান নেন। পরে তাঁদের একটি বড় অংশ মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমবেত হন।

দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী, নিরাপত্তা বাহিনী ও অন্য রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। সংঘর্ষে আন্দোলকারী, পথচারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিহত হন।

সন্ধ্যার পরও শাপলা চত্বরে অবস্থান অব্যাহত রাখেন হেফাজতের নেতাকর্মীরা।

৬ মে ভোররাতে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী শাপলা চত্বরে অবস্থানকারীদের ওপর হামলা চালায়।

পুলিশ ও র‍্যাবের সদস্যরা কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও শব্দবোমা ব্যবহার করেন। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আন্দোলনকারী নিহত হন। নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও মারধরের ঘটনাও ঘটে।

পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুসন্ধানেও নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আন্দোলকারী নিহত হওয়ার পাশাপাশি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উঠে আসে।

শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের পর হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার শুরু হয়। গ্রেপ্তার করা হয় সংগঠনটির মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী রহ.-কেও।

আল্লামা শফী রহ. সেদিন শাপলা চত্বরে উপস্থিত ছিলেন না। তবে তাঁর নেতৃত্বেই ঢাকা অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল হেফাজতে ইসলাম।

৫ ও ৬ মের হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী দমন-পীড়নের ইতিহাস তাঁর নেতৃত্বাধীন ১৩ দফা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

ইন্তেকাল ও শেষ বিদায়

জীবনের শেষ দিকে বার্ধক্য ও নানা অসুস্থতায় শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রামে চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হয়।

১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর আসগর আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন তিনি।

পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় হাটহাজারী মাদরাসায়।

জানাজায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন। মাদরাসা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় বিশাল জনসমাগম ঘটে। সমসাময়িক সংবাদমাধ্যমগুলোতে লাখো মানুষের অংশগ্রহণের খবর প্রকাশিত হয়।

জানাজায় ইমামতি করেন তাঁর বড় ছেলে মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ মাদানী।

পরে হাটহাজারী মাদরাসার কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

যে প্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষার্থী ছিলেন, শিক্ষকতা করেছেন এবং প্রায় তিন যুগ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই হয় তাঁর শেষ ঠিকানা।

রয়ে গেছে তাঁর কর্মময় জীবন

ছয় বছর পেরিয়ে গেছে।

হাটহাজারীর হাদিসের দরসে এখন আর আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর উপস্থিতি নেই। আলেমসমাজের সমাবেশেও শোনা যায় না তাঁর কণ্ঠ।

কিন্তু তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা, গ্রন্থ রচনা ও মাদরাসা পরিচালনার ইতিহাস রয়ে গেছে। রয়ে গেছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত হেফাজতে ইসলাম এবং ২০১৩ সালের আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বের ঘটনাপ্রবাহ।

বিশেষ করে শাহবাগবিরোধী খোলা চিঠি, জাতীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলন, ১৩ দফা দাবি ও ৬ এপ্রিলের লংমার্চ তাঁর কর্মজীবনের ঐতিহাসিক অধ্যায়।

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৫ ও ৬ মে শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী দমন-পীড়নের ইতিহাস।

বাংলাদেশের কওমি শিক্ষা ও ধর্মীয় আন্দোলনের কয়েক দশকের ইতিহাসের সঙ্গে এভাবেই যুক্ত হয়ে আছে আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর জীবন।

আল্লাহ তায়ালা তাঁকে মাগফিরাত দান করুন এবং জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা নসিব করুন। আমিন।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222