নাগরিক কোয়ালিশনের আয়োজনে উপেক্ষার তীর; তীব্র প্রতিক্রিয়া বিশিষ্টজনদের

by hsnalmahmud@gmail.com

হাসান আল মাহমুদ >>

‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের উদ্দেশ্যে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব নিয়ে রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এক সেমিনারের আয়োজন করে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন মিলে গঠিত ‘নাগরিক কোয়ালিশন’। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাসহ রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের একাধিক মুখ। তবে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে আয়োজনে ইসলামপন্থী দল ও আলেম সমাজের অনুপস্থিতি।

বিজ্ঞাপন
banner

সেমিনারে অংশ নেন বিশিষ্ট আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, ঐক্য কমিশনের ড. আলী রিয়াজ, বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমেদ, এনসিপির নাহিদ ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, এনডিএম-এর ববি হাজ্জাজ, গণঅধিকার পরিষদের মো. রাশেদ খান, টিআইবি’র ড. ইফতেখারুজ্জামান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী আইরিন খানসহ অনেকে।

তবে, সকল রাজনৈতিক ও নাগরিক ঘরানার অংশগ্রহণ থাকলেও ইসলামী ধারার সংগঠন বা আলেম সমাজের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। এমন বৈষম্যপূর্ণ আয়োজন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আলেম সমাজ ও ইসলামপন্থী বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ। তাদের দাবি, দেশের চলমান ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করা ইসলামপন্থীদের এ ধরনের নাগরিক আয়োজনে উপেক্ষা করা হয়েছে। এতে নাগরিক সমাজের সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চিত্র ফুটে ওঠেনি বলেই মত বিশিষ্টজনদের।

নাগরিক কোয়ালিশনের সেমিনারে কোনো আলেম বা ইসলামী দলগুলোর কোনো প্রতিনিধি না থাকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে পয়ামে ইনসানিয়াত বাংলাদেশের আমির শাইখুল হাদীস ডক্টর শহীদুল ইসলাম ফারুকী ৩৬ নিউজকে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকে সর্বশেষ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অবদান আলেম সমাজ ও ইসলামপন্থীদের। যাদের রক্ত ও ত্যাগের উপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের ইন্টেরিমসহ বেনিফিশিয়ারী সকল দল ও গোষ্ঠী। অথচ সেই ইসলামপন্থীরাই আজ রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে বেশি অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার। যার প্রমাণ নাগরিক কোয়ালিশনের সম্মেলনে সর্বদলীয় এবং সব ঘরানার মানুষকে রাখা হলেও হেফাজত সহ আলেম সমাজের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। রক্ত দিবে আলেম সমাজ আর কোয়ালিশনে তাদের স্পেস থাকবে না। এটা চরম অকৃতজ্ঞতা ও ইসলামকে এড়িয়ে চলার মনোভাব ছাড়া আর কিছুই নয়। নতুন বাংলাদেশের সকল পর্যায়ে আলেমদের প্রতিনিধিত্ব রাখতে হবে। তাহলেই তাদের রক্তদান ও ত্যাগের মূল্যায়ন করা হবে।’

অনলাইন এক্টিভিস্ট রুহুল আমীন সাদী বলেন, ‘নাগরিক কোয়ালিশনের একটা পোস্টার চোখে পড়ছে। এই নাগরিক কোয়ালিশন জিনিসটা কি কেউ কইতে পারবেন? হেফাজত, চরমোনাই কিংবা অন্যান্য ইসলামী দলের কেউই ওদের তালিকায় নেই কেনো? নাকি আলেমদের সাথে কোয়ালিশন শুধুমাত্র বিপদে পড়লেই করা লাগে? বিপদ শেষ হলে তুমি কে চিনিনা?

রায়হান মুহাম্মাদ ইবরাহীম অভিযোগের সুরে বলেন, ‘আন্দোলন সফল করবে হুজুররা, আর সুফল ভোগ করবে অন্যরা! নাগরিক কোয়ালিশন করেছেন। এখানে হুজুররা কই? বক্তার কাতারে নাই; শ্রোতার কাতারেও নাই! তারা কি দেশের নাগরিক না? ভাড়াটিয়া?
তিনি বলেন, অথচ গত কয়েকদিনের আন্দোলনে ৮০% ছিল ইসলামপন্থী। ৮% পথচারী। এনসিপি, বৈষম্যবিরোধী শক্তির নানা ব্যানার, বাম ও মেয়েরা মিলে বাকি ১২%। একজন সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তার রিপোর্ট এটি।’

তিনি বলেন, তবে ইসলামপন্থীদের চিরদিনই অবহেলা করা হয়। উপদেষ্টা পরিষদে তারা নেই। একজন যাও আছেন, তাকে হিন্দু বৌদ্ধ কৃসচিয়ান ও ইসলাম মিশ্রিত ধর্ম মন্ত্রণালয়েই আটকে রাখা হয়েছে। দেশ গঠন ও জনকল্যাণমুখী আর কোনো মন্ত্রণালয় দেওয়া হয় না। অথচ অনেক এনজিওবিদ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। রাজনীতিতে সুবিধা, বিভিন্ন কার্যকর চেয়ার, রাষ্ট্রদূত, মেয়র পদ, ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনী জোটে সম্মানজনক আসন বন্টন, আন্তরিকতার সঙ্গে সনদের স্বীকৃতি কার্যকর, মিডিয়ায় ইতিবাচক উপস্থাপন ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হয়। জীবন দান, জেল জুলুম সহ্য, ত্যাগ সংগ্রাম ও কোরবানি ইসলামপন্থীরাই দেন, কিন্তু তাদের সাথে সবসময়ই প্রতারণা করা হয়। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে ইনশাআল্লাহ। তরুণদের পাওনা বুঝে নিতে হবে কড়ায় গন্ডায়। জুলাই বিপ্লবের এটাও একটা শিক্ষা।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রচার সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী ৩৬ নিউজকে বলেন, ‘নাগরিক কোয়ালিশনে হেফাজতে ইসলাম ও ইসলামপন্থী দলদের প্রতিনিধি না রাখার চরম বৈষম্য আচরণ করেছে। বৈষম্য বিরোধী বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনের বৈষম্যপূর্ণ আচরণ করায় সাধারণ নাগরিক হতভম্ব। অতীত ভুলে গেলে চলবে না। হেফাজতের ত্যাগের বিনিময়ে আজকে এই বাংলাদেশ। সুতরাং হেফাজত ও ইসলামপন্থী দলের প্রতিনিধিদেরকে অন্তর্ভুক্ত করুন নাগরিক কোয়ালিশনে। মনে রাখতে হবে, হেফাজত ও ইসলাম পন্থীদেরকে মূল্যায়ন না করলে অনেক খেসারত গুনতে হবে আপনাদের।’

এছাড়াও কওমি উদ্যোক্তা রোকন রাইয়ান নাগরিক কোয়ালিশনকে ‘বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “ইসলামি নেতৃত্বকে বাদ দিয়ে গঠিত কোয়ালিশন মানি না।” ইসলামী যুব আন্দোলনের সেক্রেটারি মানসুর আহমাদ সাকী একে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ ইখতিয়ার হুসাইন বলেন, “ঘেন্না আর ঘেন্না— এটাই নাগরিক কোয়ালিশনের চেহারা। সহযোগী ইসলামী সংগঠনগুলোকে সাইড করে রাখার প্রোগ্রামে জামায়াত নেতাদেরও যোগ দেওয়া ঠিক হয়নি।”

এদিকে জুলাই বিপ্লবের অন্যতম নেপথ্য পরিকল্পনাকারী পিনাকী ভট্টাচার্য বলেন, “হেফাজত, চরমোনাইসহ ইসলামপন্থী শক্তিগুলো দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। নাগরিক সমাজের এমন উদ্যোগে তাদের প্রতিনিধিত্ব না রাখা অগ্রহণযোগ্য।”

নাগরিক কোয়ালিশনের মত একটি বৃহৎ ও সমন্বিত উদ্যোগে ইসলামপন্থী দল ও আলেম প্রতিনিধিদের উপেক্ষা করায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠী বঞ্চনার শিকার। এই পরিস্থিতি সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন আলেম সমাজ, ইসলামপন্থী দল ও বিশিষ্ট নাগরিকরা।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222