29
শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে সাক্ষাৎ শেষে আমরা যখন বেরিয়ে এলাম, ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে সোয়া একটার ঘরে। ইতিমধ্যে যোহরের আজান হয়ে গেছে। নামাজ পড়তে আমরা পার্শ্ববর্তী এক মসজিদে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি জামাত শেষ। আলাদা নামাজ পড়ে নিলাম। মসজিদের পাশেই ছোট্ট হেফজখানা। হেফজখানার দু চারজন ছোট ছোট ছাত্রের সাথেও আমাদের সাক্ষাৎ হলো মসজিদেই। কথা বলতে চাইলাম তাদের সাথে। কিন্তু ভাবের আদান-প্রদান করতে পারলাম না ভাষার অভাবে। আমরা যেসব ভাষা জানি তারা তা বুঝে না। তারা যে ভাষা বুঝে আমরা তা জানি না। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ফারসি শব্দে কিছু বলতে চাইলাম, বাচ্চাগুলো বুঝলো না।
নামাজ শেষে গাড়ির বহর আমাদেরকে নিয়ে স্থানীয় এক রেস্তোরায় গেল দুপুরের খাবার খেতে। রেস্তোরাঁ গুলোতে বসার দুই রকম ব্যবস্থা থাকে। চেয়ার টেবিল থাকে থরে থরে সাজানো আমাদের দেশের রেস্টুরেন্টগুলোর মত। আর এক পাশে থাকে উঁচু মেঝেতে কার্পেট বিছানো। গাদ্দা থাকে হেলান দেয়ার জন্য। খাবার পরিবেশন এর জন্য মেঝের উপর তিনচার ইঞ্চি উঁচু কাঠের টেবিল পাড়া থাকে। সেখানে ফ্লোরে বসে খাবারের আয়োজন হয়। স্বাভাবিকভাবেই আমরা যারা মেঝেতে বসে খেয়ে অভ্যস্ত, আমরা সেখানে বসলাম আর যারা মাটিতে বসতে পারেন না তারা চেয়ার টেবিলে বসলেন।
এখানকার খাবার প্রধানত শুকনো। চাল থাকে। রুটি থাকে। সাথে কয়েক প্রকার কাবাব থাকে। বুটের ডাল ও সালাদ থাকে। সালাদের মধ্যে থাকে টক দই । খাবার সুস্বাদু।
দুপুরের খাবার খেয়ে আবারো আমরা চেপে বসলাম যার যার গাড়িতে। গাড়ির বহর ছুটলো সামনের দিকে। কিছুদূর সমতলে চলার পর শুরু হল পাহাড়ি পথ। কিছুটা আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে সমতল ভূমি থেকে অনেকটা উচ্চতায় পৌঁছে গেল আমাদের গাড়ির বহর।
পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় নয়নাভিরাম একটি পার্ক। সুন্দর পরিপাটি পায়ে হাঁটার লন। সারি সারি ফুল গাছ। এক প্রান্তে তার অপরূপ একটি মসজিদ।ছয়কোনা মসজিদের মধ্যখানে সোনালী রঙের বিশাল গম্বুজ। মসজিদে আকসার ক্বুব্বাতুসসাখরার (ডেম অফ দ্যা রক) আদলে গড়া নয়নাভিরাম এই মসজিদটির নাম ফলকে লেখা মোল্লা মোহাম্মদ ওমর জামে মসজিদ।পাহাড়ের শীর্ষ চূড়ায় অবস্থিত এই মসজিদের অদূরেই নীল আকাশ ছুঁয়ে শুভ্র সফেদ কালেমা খচিত ইমারাতে ইসলামিয়ার বিশাল এক পতাকা পতপত করে উড়ছে। তাওহীদে বিশ্বাসী যে কোন মুমিনের হৃদয় পবিত্র কলেমার এই বিজয়দৃশ্য দেখে আন্দোলিত হবেই।
আমাদের ভ্রমণ গাইড জানালো স্থানটির নাম ওজির আকবার খান। তথ্যসূত্র ঘেটে দেখলাম তুরস্ক ভিত্তিক একটি দাতব্য সংস্থা আইডিডিইএফ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মসজিদটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় ২০২৩ সালে। ইমারতের প্রভাবশালী মন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানিসহ অন্যান্য শীর্ষ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গ মসজিদের উদ্বোধন করেন।
মসজিদের পাশে ৮০ মিটার (২৬০ফুট) উঁচু দন্ডের চূড়ায় উড্ডীন পাতাকাটি প্রশস্ততায় ৪০ মিটার ও দৈর্ঘ্যে ২৬ মিটার। সুউচ্চ পাহাড়ের উপর আরো এত উচ্চতা, যেন আকাশ ছুঁয়ে আছে। নীল আকাশের গায়ে ভেসে বেড়ানো শুভ্র সাদা মেঘের দলের সাথে তার মিতালী। মুক্ত বিহঙ্গের মতো যেন তা ডানা মেলে উড়ছে।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ-পবিত্র কালেমার বিজয়ের প্রতীকি চিত্রটি ছিল আমার জীবনে দেখা সুন্দরতম দৃশ্য। সবুজ জমিন থেকে উঠে নীল আকাশের গায়ে পতপত ধ্বনিতে যেন পতাকাটি সগৌরবে ঘোষণা করছে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের অমোঘ বার্তা। ইসলামের বিজয়ের ভূমিতে মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের নামে প্রতিষ্ঠিত মসজিদে আকসার এই আদল, সেই সাথে আকাশ ছোঁয়া কালেমার পতাকা, সব মিলিয়ে এ যেন আল আকসা বিজয়ের শপথ।
আল্লাহু আকবার!
কি এক নয়নাভিরাম দৃশ্য! কি এক দৃড়চেতা অঙ্গীকার!
পতাকাটা দুলছিল। সেইসাথে আন্দোলিত হচ্ছিল আমার বক্ষ। আহা বিজয়ের এমন দৃশ্য যেন জনম জনমের লালিত স্বপ্ন। স্বপ্ন পূরণের আনন্দে নেচে উঠল মন। নিজের অজান্তেই সরব হয়ে উঠল কণ্ঠ। আল্লাহর বড়ত্বের ধ্বনি উচ্চারিত হলো হৃদয়ের গভীর থেকে। কল্পনার ভেলায় ভেসে ফিরে গেলাম দূর অতীতে।
আহা এই একটি পতাকার জন্য বিসর্জন গেছে কত প্রাণ অগণন। ঝরেছে কত তপ্ত লহু।শহীদের রক্তে লাল হয়েছে কত পাহাড় উপত্যকা।
বিগত শতাব্দীর সত্তুরের দশক থেকে প্রায় অর্ধশতাবদিকাল। প্রথমে রাশিয়ার আগ্রাসী শক্তি অতঃপর আমেরিকা ও ন্যাটোর হায়েনাদল। সাথে ছদ্মবেশী স্বজাতির মোনাফেক গোষ্ঠী। কত শত্রুর সাথে লড়াই করে, কত বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে বীর আফগান জাতি আজ এসে দাঁড়িয়েছে বিজয়ের এই পর্বতচূড়ায় ।
পাহাড়ের চূড়া থেকে সারা কাবুল শহর দেখা যায়। দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত ঘন বসতিপূর্ণ ঐতিহ্যের নগর। উঁচু নিচু পাহাড়, উপত্যকা আর সমতল ভূমি-এই তিনে মিলেই আফগান রাজধানী কাবুল। আধুনিক স্থাপত্যের তুলনায় পুরনো ভবন-বিল্ডিং এর পরিমাণ অনেক বেশি। পাহাড়ের গায়েগায়ে অনেক বসতী। আঁকাবাঁকা পথগুলো পাহাড়ের গা বেয়ে উঠেছে আবার নেমেছে। চারি দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে শহরটা বার কয়েক দেখলাম। কিন্তু দৃষ্টি বারবার ফিরে আসে আকাশছোঁয়া কালেমাখচিত সেই সাদা পতাকার দিকে। যতই দেখি ততই মুগ্ধ হই। এক জনমে বুঝি শেষ হবে না এই মুগ্ধতা!
সময় গড়িয়ে গেছে অনেকটা। গাইড তাড়া দিলেন ফেরার। আমরা উঠে বসলাম গাড়িতে। গাড়ির বহর ছুটল আমাদের নিয়ে কাবুল স্টার হোটেল-গন্তব্যের দিকে…
লেখক: আল্লামা মামুনুল হক
১২ জিলহজ্ব
মিনার তাবু থেকে
মক্কা মুকাররামাহ
টিএইচএ/