হাসান আল মাহমুদ >>
ঈদুল আজহার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ কোরবানির পশুর চামড়া। দীর্ঘদিন ধরেই এই চামড়া হয়ে উঠেছিল কওমি মাদরাসাগুলোর জন্য অতিরিক্ত অর্থায়নের উৎস। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে সিন্ডিকেট, ট্যানারি মালিকদের কারসাজি এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতার ফলে এই চামড়ার আর্থিক মূল্য পড়েছে তলানিতে। এমন বাস্তবতায় সমাজসচেতন আলেম, শিক্ষক ও মাদরাসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন—এই প্রথা কী চালিয়ে যাওয়া উচিত?
ঈদুল আজহার পরপরই চামড়া বিক্রির মূল্য নিয়ে উঠেছে নানা অভিযোগ ও অসন্তোষ। সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। অথচ ঢাকার বিভিন্ন মাদরাসা থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার পিস চামড়া সংগ্রহ হলেও এর প্রকৃত আয় নিয়ে দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি।
আলেম-সাংবাদিক মুফতি এনায়েতুল্লাহ বলেন, ‘একটি মাদরাসা যদি ২ হাজার চামড়া পায় এবং তা ৭০০-৯০০ টাকা দরে বিক্রি হয়, তাহলে আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৮ লাখ টাকা। কিন্তু এই হিসাবটা পুরোটা ঠিক নয়। কারণ—
প্রথমত, সব চামড়া বিনা মূল্যে পাওয়া যায় না; অনেক ক্ষেত্রে মূল্য দিয়ে কিনে আনতে হয়।
দ্বিতীয়ত, এই চামড়ার টাকা একবারে পাওয়া যায় না, অনেক সময় তিন-চার মাস পর্যন্ত বাকি থাকে।
তৃতীয়ত, যে মাদরাসা এত চামড়া পায়, সেখানে ছাত্রসংখ্যাও বেশি থাকে। তারা যদি ঈদের সময় মাথাপিছু ১ হাজার টাকা অনুদান দেয়, তবে চামড়ার চেয়ে বেশি অর্থ জমা হতে পারে।
চতুর্থত, একটি সাধারণ মাদরাসার বার্ষিক খরচই ৫-৬ কোটি টাকা হয়, যা মূলত জনগণের দান থেকেই আসে।”
তিনি আরও বলেন, ‘একসময় চামড়ার ভালো দাম ছিল, ট্যানারি মালিকরাও তুলনামূলক সৎ ছিলেন। এখন অনেকেই এই পেশায় ঢুকেছে নানা ফাঁকি ও সিন্ডিকেট নিয়ে। তারা জানে, হুজুররা চামড়া কালেকশন করবেই, আর আমরা বসে বসে কিনে নেব। অন্যদিকে কোরবানিদাতারাও মনে করে চামড়া হুজুরদের দান করা দায়িত্ব। এতে চামড়ার প্রতি সম্মানও হারিয়ে গেছে।”
মুফতি এনায়েতুল্লাহর প্রশ্ন, “যখন আল্লাহর রহমতে কোটি টাকার খরচের বন্দোবস্ত হয়, তখন এই বিশ লাখ টাকার জন্য হাহাকার কেন? ব্যবসায়ী আর মাদরাসা—উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করুক।”
সমাজসেবক আলেম মাওলানা গাজী ইয়াকুব বলেন, ‘মহানগরের বহু মাদরাসার চামড়া অবিকৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এত পরিশ্রম, এত চেষ্টা—সবই যেন পণ্ডশ্রম হয়ে গেল। আমাদের নতুন করে ভাবা উচিত এই চামড়া প্রথা নিয়ে।’
হাফেজ ক্বারী নেছার আহমাদ আন-নাছিরী বলেন, ‘সরকার চামড়ার সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতি বছর কওমি মাদরাসাগুলো চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এই চিত্র প্রমাণ করে, সরকার এই সংকট সমাধানে আন্তরিক নয়।’
লেখক জুবায়ের রশীদ বলেন, ‘হে কওম! অনেক হয়েছে, এবার চামড়া কালেকশন ছেড়ে দিন। গড়ে একটি মাদরাসা ২০০ চামড়া পায়, ধরুন ৫০০ টাকা করে বিক্রি হলেও এক লাখ টাকা আসে। তার মধ্যে ২০ হাজার খরচ বাদ দিলে থাকে ৮০ হাজার টাকা। এত কষ্ট করে, ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে শিক্ষক-ছাত্ররা যা পায়, তা দিয়ে তো পাঁচদিনও মাদরাসা চলে না।’
তিনি আহ্বান জানান, ‘মাদরাসা কর্তৃপক্ষ সাহস করে এবার চামড়া সংগ্রহ বন্ধ করুন। সম্মান নিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করুন। এই সংস্কার আজ আপনি করলে, একদিন সবাই অনুসরণ করবে।’
হাআমা/
