মনপুরায় পানিবন্দি মানুষ বাড়ছে; ত্রাণ তৎপরতায় কমছে দুর্ভোগ

আল-আমিন শাহরিয়ার

by Masudul Kadir

জেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরায় টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে বহু এলাকা ডুবে গেছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও চরাঞ্চলের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। আর এতে কর্মহীন হয়ে পড়ায় নিম্নআয়ের বহু পরিবারের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্যসংকট। অব্যাহত বর্ষণে দীর্ঘ সময় ধরে পানি আটকে থাকায় বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এরই মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন, এনজিও এবং বিএনপি নেতাকর্মীরা সহায়সম্বলহীন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য শুরু করেছেন।

মেঘনা নদীর পানি বিপৎসীমার ১ মিটার (১০০ সেন্টিমিটার) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বেড়িবাঁধের ভেতর ও বাইরের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ৫ থেকে ৬ ফুট জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গিয়ে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে ঢাকা-মনপুরা নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ রামনেওয়াজ লঞ্চঘাটও জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা।

বিজ্ঞাপন
banner

আজ শনিবার দুপুর ১টায় ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বাসস’কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ১ নম্বর মনপুরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব পাশের ৬০টি কলোনি জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও বুকসমান পানি জমে রয়েছে। এতে অন্তত ৮০ টি পরিবারের সদস্য নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। অনেককে ঘরের টিনের ছাদে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে।

অন্যদিকে, বেড়িবাঁধবিহীন ৫ নম্বর কলাতলী ইউনিয়নের চরকলাতলী, কাজীরচর ও ঢালচর এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ আকার ধারণ করেছে। কলাতলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আমিন তালুকদার বাসস’কে জানান, এসব এলাকায় ৬ থেকে ৭ ফুট জোয়ারের পানিতে বিস্তীর্ণ জনপদ তলিয়ে গেছে।

গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে উপকূলজুড়ে ভারী বর্ষণ ও অতি জোয়ার অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে বুক সমান পানি জমে থাকায় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অতি বৃষ্টি ও প্রবল ঘূর্ণি বাতাসের ফলে বহু এলাকার বাসিন্দারা ঘর থেকে বের হতে না পারায় দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম ও দৈনন্দিন কাজকর্ম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

টানা বৃষ্টি ও প্রবল জোয়ারের কারণে কাজকর্ম করতে না পারায় দিনমজুর, জেলে, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। দৈনন্দিনের আয় বন্ধ থাকায় অনেক পরিবারের চুলায় হাঁড়ি উঠছে না। খাদ্যসংকটে পড়া পরিবারগুলো দ্রুত শুকনো খাবার, চাল-ডাল ও বিশুদ্ধ পানির সহায়তা চেয়েছেন।

আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় সরেজমিনে দেখা গেছে, গত ১৫ দিন ধরে বৃষ্টি ও জোয়ারের তীব্রতায় পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অসংখ্য পরিবারের বাড়িঘর ডুবে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট।

মনপুরা উপজেলার কলাতলি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম, সাকুচিয়া ইউনিয়নের খারির খাল এলাকা, মাস্টারহাট, লতাখালী ও বাতানখালী এলাকার পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া বিচ্ছিন্ন কলাতলী ইউনিয়নের ঢালচর, কাজীরচর ও কলাতলী চরের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল তিন থেকে চার ফুট পানিতে ডুবে গেছে। এসব এলাকার বাসিন্দারা এখন নিদারুণ কষ্টে দিন-রাত কাটাচ্ছেন।

দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের রহমানপুর গ্রাম ও দক্ষিণ সাকুচিয়া এলাকার বিভিন্ন গ্রামে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। হাজিরহাট ইউনিয়নের দাসেরহাট ও চর যতিনের নিম্নাঞ্চল, সোনারচর গ্রামের পূর্ব ও পশ্চিম অংশেও পানি জমে রয়েছে। মূল ভূ-খণ্ডের পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলেও জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

মনপুরার হাজিরহাট ইউনিয়নের বাসিন্দা-বরকত মঝি, সফিউল্লাহ মাঝি, ওবায়দুল মাঝি, দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের আবুল মাল, রহিমা খাতুন; উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের মোতালেব মাঝি, এবং মনপুরা ইউনিয়নের সফিফ কাজী ও গৃহিনী মাজেদা বেগম বলেন-পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই চারপাশে বেড়িবাঁধের কাজ চলায় জোয়ারের পানি এবং বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

এদিকে, জলাবদ্ধতার কারণে অনেক নলকূপ ডুবে থাকায় এতে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এতে ডায়রিয়া, জ্বর, চর্মরোগসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীদের নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারগুলো।

মনপুরা উপজেলা বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাড. সালাউদ্দিন প্রিন্স বাসস’কে বলেন, এমপি নুরুল ইসলাম নয়নের নির্দেশনায় দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে দুর্গত এলাগুলোতে গিয়ে অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহযোগিতা অব্যহত রেখেছি। ফলে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমছে।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, জেলার দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে বিশেষ টিম কাজ করছে।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বাসস’কে বলেন, সারাদেশের মতো মনপুরাতেও টানা বর্ষণ ও জোয়ারের কারণে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কারও হাত নেই। তবে পানি নিষ্কাশনের কাজ চলমান রয়েছে।

এছাড়াও জেলার চরফ্যাশনের ঢাল চর, কুকরী-মুকরী, চর পাতিলা, কচ্ছপিয়া, ভোলা সদরের ইলিশা, রামদাসপুর, মাঝের চর, বরাইপুর, দৌলতখানের মদনপুর, হাজীপুর চর নেয়ামতপুরে প্লাবিত এলাকাগুলোর পানির উচ্চতা এখন কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার অধিবাসী ও জনপ্রতিনিধিগণ। পানির এ প্রবাহ এখন নিম্মমূখি হওয়ায় সেখানকার চরাঞ্চলের মানুষ এখন শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন সেখানকার পানি উন্নয়ন বোর্ড।

মনপুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.আবু মুছা বাসস’কে বলেন, জলাবদ্ধতা নিষ্কাশন ও পানিবন্দি মানুষকে রক্ষায় আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের সমন্বয়ে কাজ করছি। ইতোমধ্যে অসহায় সম্বলহীনদের তালিকা প্রনয়ণ করা হয়েছে।

এদিকে দুর্যোগকবলিত মনপুরা-চরফ্যাশনের মানুষের সার্বিক খোঁজ-খবর নিচ্ছেন-সেখানকার (ভোলা-৪ আসন) সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল ইসলাম নয়ন।

তিনি বাসস’কে বলেন-পানিবন্দি মনপুরা ও চরফ্যাশন উপজেলার ভুক্তভোগী মানুষের তালিকা প্রনয়ণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সার্বিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

তিনি জানান, পানিবন্দি অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে ইতিমধ্যেই মনপুরা ও চরফ্যাশন বিএনপি নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছি। চরাঞ্চল কিম্বা নিম্নাঞ্চলের একটি পরিবারও সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হবেন না বলেও জানান সরকারের দায়িত্বশীল এ সংসদ সদস্য।

ভোলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বাসস’কে বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর সতর্কতা বহাল রয়েছে এবং স্থানীয় নদীবন্দরসমূহে এক নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল আছে।

তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় সর্বমোট ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক ডা.শামীম রহমান বাসস’কে জানিয়েছেন-দুর্গত মানুষের জন্য দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রনালয় ১শ’মেট্রিক টন চাল ও ৫ লাখ টাকা দিয়েছে। তাছাড়া দুর্যোগ পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনের কোষাগারে পর্যাপ্ত খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য উপকরণ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কোনো মানুষ যেন সহযোগিতাহীন না থাকেন, সেজন্য তার প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছেন বলেও জানান তিনি।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222