বিশেষ প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকায় মাইজভান্ডারিপন্থীদের হঠাৎ বিশাল জমায়েত ও একাধিক পয়েন্টে জশনে জুলুস আয়োজনের পেছনে বড় ধরনের ‘গোয়েন্দা ব্যর্থতা’ ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে গত ২৬ আগস্ট সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় অনুষ্ঠিত এই বিশাল কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো শহরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েন।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তার এক বিশেষ পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেছেন যে, সরকারি ছুটির দিনে চট্টগ্রামের এই বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীটি রাজধানীর রাজপথ ও উদ্যান কার্যত নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নীরবতা ও অনুমতি প্রদানের ধরন নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক পটভূমি ও আওয়ামী যোগসূত্র
অভিযোগে প্রকাশ করা হয়, মাইজভান্ডারিপন্থী এই গোষ্ঠীটি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের একটি প্রভাবশালী শরিক ছিল। তাদের রাজনৈতিক শাখা ‘বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন’-এর প্রধান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি আওয়ামী লীগের একাধিকবারের এমপি ছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলার আসামি এবং বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন।
অন্যদিকে ২৬ আগস্টের ঢাকা সমাবেশের মূল আয়োজক ছিলেন সাইফুদ্দিন আহমেদ মাইজভান্ডারি, যিনি নজিবুল বশরের আপন ভাতিজা। অভিযোগ রয়েছে, গত ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনকে বৈধতা দিতে তিনি ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি’ (বিএসপি) নামে একটি তথাকথিত ‘কিংগস পার্টি’ গঠন করে তড়িঘড়ি নিবন্ধন বাগিয়ে নেন এবং ‘লিবারেল ইসলামিক জোট’-এর অধীনে ২০০ আসনে প্রার্থী দেন।
গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা শঙ্কা
জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ মিত্র হিসেবে পরিচিত এই গোষ্ঠী কীভাবে হঠাৎ ঢাকায় এসে এত বড় জমায়েতের অনুমতি পেল—তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে। অতীতের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, মাইজভান্ডারি গোষ্ঠী মূলত চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক র্যালি ও সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজন করত। কিন্তু এবার চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত বাস, ট্রাক ও পিকআপে লোক এনে ঢাকায় যে শোডাউন দেওয়া হলো, তা গোয়েন্দা সংস্থা ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নজরে কীভাবে অনুমোদন পেল, তা বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি করেছে।
এছাড়া দেশের প্রতিষ্ঠিত টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ব্যাপক প্রচারের জন্য মিডিয়া কভারেজ আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল, যা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত বল মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন মহল মনে করছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই সময়ে নিষিদ্ধ ও বিতর্কিত আওয়ামী মিত্রদের রাজপথে এমন বিশাল কর্মসূচি আয়োজনের সুযোগ দেওয়াটা নিঃসন্দেহে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বড় ধরনের ব্যর্থতা। এই আয়োজনের নেপথ্যে কার বা কাদের ছত্রছায়া ছিল, তা নিবিড়ভাবে তদন্ত করে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
