কক্সবাজার মহাসড়কে চলছে নৌকা

by Masudul Kadir

সাগরের পাশে সেই কক্সাবাজর। ডুবে গেছে মহাসড়কও। গ্রামের পর গ্রাম পানির নিচে। কক্সবাজারের এই দুরবস্থায় পর্যটন ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়েছে। কয়েক দিনের টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের রামু উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে তীব্র নদীভাঙনে মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, আবাদি জমি ও গ্রামীণ সড়ক। বিভিন্ন জায়গায় কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহনের পরিবর্তে নৌকায় চলাচল করছেন অনেকে।

বিজ্ঞাপন
banner

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, রাজারকুল ও দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল। টানা বর্ষণে বাঁকখালী নদী ও এর শাখা-প্রশাখার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে আশপাশের জনপদ প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বহু পরিবার আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি কিংবা উঁচু স্থানে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।

পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। রান্নাবান্না প্রায় বন্ধ, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর অভাবে বিপাকে পড়েছেন তারা। সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থরা।

এদিকে প্লাবনের পাশাপাশি নদীভাঙন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। প্রবল স্রোতে নদী তীরবর্তী এলাকায় একের পর এক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন না। ফলে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।

প্লাবনের কারণে স্থানীয় সড়ক, কাঁচা রাস্তা ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমন ধানের বীজতলা, বিভিন্ন সবজিখেত ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নদীভাঙনের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের দোছড়ি দক্ষিণকূল পূর্বপাড়া এলাকায়। সেখানে প্রবল স্রোতে নদীর পাড় ধসে ইতোমধ্যে কয়েকটি বসতবাড়ির বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও বহু বাড়ি এখন ভাঙনের মুখে।

ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা সিরাজুল হক বলেন, প্রবল বর্ষণে আমার শেষ সম্বল বসতবাড়ির অর্ধেক নদীগর্ভে চলে গেছে। বাকি অংশও ভাঙনের মুখে। কখন পুরো বাড়িটাই নদীতে হারিয়ে যাবে, সেই আতঙ্কে দিন কাটছে।

একই এলাকার দিনমজুর মোজাম্মেল হক বলেন, প্রতিবছর নদীভাঙন হচ্ছে। এখন ভাঙন আমার বাড়ির উঠান পর্যন্ত চলে এসেছে। শুধু অপেক্ষা করছি, কখন নদী আমার বাড়িটাও গিলে ফেলে। পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব, সেই দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না।

কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু মোহাম্মদ ঈসমাইল নোমান বলেন, টানা বর্ষণ ও নদীর তীব্র স্রোতের কারণে ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী কয়েকটি এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে একাধিক পরিবারের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ছে। দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

মিঠাছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা ক্রীড়াবিদ সাঈদ হোসেন আকাশ জানান, মিঠাছড়ির প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। রামু-টেকনাফ মহাসড়কের বেশ কয়েকটি অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে সেখানে গাড়ির বদলে নৌকায় মানুষ চলাচল করছে।

কাউয়ারখোপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামশুল হক জানান, তার ইউনিয়নের মনিরঝিল, কাউয়ারখোপ ও ফরেস্ট অফিসসংলগ্ন বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের পাশাপাশি পানিবন্দি মানুষের মধ্যে জরুরি খাদ্য সহায়তা ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

তবে ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, শুধু ত্রাণ নয়-নদীভাঙন রোধে স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দ্রুত পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

রামু উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্লাবন ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সরকারি সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিন ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকলে প্লাবন ও নদীভাঙনের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হওয়ার আগেই জরুরি ভিত্তিতে নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222