নিজস্ব প্রতিবেদক :: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ১১ দলীয় ঐক্যের নারীদের অংশগ্রহণে এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আবু সাঈদসহ অসংখ্য তরুণের আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য ছিল স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। শহীদদের সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অবিলম্বে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় কার্যকর করার দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে এ দাবির আন্দোলনে ১১ দলীয় ঐক্য অটুট রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সোমবার (২০ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি মারজিয়া বেগমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন শহীদ জাবির ইব্রাহীমের মা রোকেয়া বেগম এমপি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান এমপি বলেন, ‘জনগণ গণভোটে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করে বিএনপি প্রথমে সেই অঙ্গীকার থেকে সরে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাইয়ে যেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করেছিলেন, একইভাবে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতেও নতুন আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব।’
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘যদি জুলাই সনদকে অবৈধ বলা হয়, তাহলে বর্তমান সরকার ও মন্ত্রিসভার বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অবিলম্বে সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে সংস্কার পরিষদ গঠন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সংসদে সমাধান না হলে রাজপথেই সমাধান হবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি সাইদা রুম্মান বলেন, ‘২০২৪ সালের গণআন্দোলন ছিল একটি ঐতিহাসিক বিপ্লব, যার ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু সেই সরকারই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। তিনি বলেন, সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে দাবি আদায় সম্ভব।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য মনিরা শারমিন এমপি বলেন, ‘জুলাইয়ের স্মৃতি সাধারণ মানুষ সময়ের সঙ্গে ভুলে গেলেও শহীদ পরিবার কখনো ভুলতে পারবে না। শাপলা ও জুলাইয়ের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে এবং সরকারকে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে তারা জুলাইয়ের চেতনার পক্ষেই রয়েছে।’
জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি আয়েশা সিদ্দিকা পারভীন এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাসমিন রানা বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের নতুন অর্জনের ভিত্তি। জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে যে রায় দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই রাষ্ট্রকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’
জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স সেক্রেটারি ড. হাবিবা চৌধুরী সুইট বলেন, ‘১৯৭১ আমি দেখিনি, তবে ২০২৪ সালের জুলাই নিজের চোখে দেখেছেন। জুলাইয়ের আন্দোলন কোনো একক দলের ছিল না; সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। জুলাই সনদের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ শক্তির মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা চলছে। এ ধরনের ষড়যন্ত্র থেকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধানের অজুহাত দেখিয়ে আর সময়ক্ষেপণ করা যাবে না। সম্মিলিতভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি আদায় করতে হবে।’
এনসিপির সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু বলেন, ‘জুলাইয়ের ভয়াবহ পরিস্থিতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বাড্ডায় নিজের চোখের সামনে গুলির ঘটনা দেখেছি সেই ট্রমা কোনোদিন ভোলার নয়। শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কার, জুলাই গণহত্যা এবং শহীদ হাদি হত্যার বিচার করতে হবে।’
বাংলাদেশ লেবার পার্টির যুগ্ম মহাসচিব সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ কখনো ভোলার নয়। শুধু জুলাই নয়, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। বর্তমান সরকার গত কয়েক মাসে প্রমাণ করেছে তারা জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়। তাই আরও শক্তিশালী আন্দোলনের প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবা হাকিম বলেন, ‘যেসব পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে, তাদের ক্ষতি কখনো পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে সুষ্ঠু তদন্ত, ন্যায়বিচার, আহতদের উন্নত চিকিৎসা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং শাপলার শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।’
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) নেত্রী অধ্যাপিকা কারিমা খাতুন বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হন এবং আমিও আহত হই। আমি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পাশাপাশি নারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মাহবুবা আক্তার রলি বলেন, ‘আমরা ১৯৫২ বা ১৯৭১ দেখেননি, কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আবু সাঈদদের আত্মত্যাগ প্রত্যক্ষ করেছি। সেই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছিল। পুরোনো সেই পরিস্থিতিতে দেশকে আর ফিরতে দেওয়া যাবে না।’
জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য নাজমুন্নাহার নীলু এমপি বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাইয়ে তরুণদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। সরকার কি এসব মূল্যবোধ চায় না বলেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিলম্ব করছে? দ্রুত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে মারজিয়া বেগম এমপি বলেন, ‘জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ, ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং নতুন বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে জুলাই সনদ কার্যকর করা সময়ের দাবি।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন ডাকসুর সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না, শহীদ শাহরিয়ার শুভর স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা, শহীদ সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম, জুলাই শহীদ নাজমুল কাজীর স্ত্রী মারিয়া সুলতানাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নারী নেত্রীরা। সভায় ১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
