বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস কিংবা অন্য যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবনে কঠিন পরীক্ষা হয়ে আসে। এসব দুর্যোগে অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও জীবিকার উৎস হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে।
এমন সময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্বই নয়, বরং ইসলামের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। একজন মুমিন নিজের স্বার্থের গণ্ডি পেরিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষের কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসবেন- এটাই ইসলামের শিক্ষা।
অসহায় মানুষের চোখের অশ্রু মুছে দেওয়া, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়া এবং বিপদে সাহস জোগানো- এসব কাজ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।
বিপদগ্রস্ত মানুষের সহযোগিতা করা তাকওয়ার পরিচয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো; আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।’ -সূরা মায়েদা: ২
বন্যা ও দুর্যোগের সময় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, পোশাক কিংবা অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ মানুষের উপকার করা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে-ই, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ -তাবারানি: ৫৭৮৭
অতএব, দুর্যোগে মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য এগিয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি কাজ। আর মানুষ মানুষের পাশে কেন দাঁড়াবে না? মুমিনরা তো পরস্পরের ভাই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ -সূরা হুজুরাত: ১০
আর ভ্রাতৃত্বের এই সম্পর্ক শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিপদের সময় একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই এর প্রকৃত প্রকাশ ঘটে।
এ ছাড়া অন্যের কষ্ট দূর করার প্রতিদান তো রয়েছেই। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহতায়ারা কেয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ -সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯
তাই বলা যায়, বন্যাদুর্গত মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে কাজ করবে, আল্লাহ তার জন্য আখেরাতে মহা প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।
এছাড়া দান-সদকার প্রতিদান বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়; প্রতিটি শীষে থাকে একশত দানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেন।’ -সূরা বাকারা: ২৬১
তাই দুর্যোগে দেওয়া একটি খাবারের প্যাকেট, একটি কম্বল বা সামান্য অর্থও আল্লাহর কাছে অমূল্য হয়ে যেতে পারে। এটা রহমত লাভের অন্যতম উপায়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা পৃথিবীর মানুষের প্রতি দয়া করে, পরম দয়ালু আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন।’ -জামে তিরমিজি: ১৯২৪
তাই অসহায় মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম। শুধু অর্থ নয়, যেকোনো সহযোগিতাই সদকা। অনেকে মনে করেন, অর্থবানরাই শুধু সহযোগিতা করতে পারেন। অথচ ইসলাম বলে, সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনো সহযোগিতাই সদকা। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক ভালো কাজই সদকা।’ -সহিহ মুসলিম: ১০০৫
অতএব, খাদ্য বিতরণ, উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণ, অসুস্থদের সেবা, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, এমনকি সান্ত্বনার একটি বাক্যও আল্লাহর কাছে সওয়াবের কাজ। একজন সত্যিকারের মুমিন কখনো অসহায় মানুষের কষ্ট দেখে নির্লিপ্ত থাকতে পারেন না। তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, কারণ তিনি জানেন- মানুষের সেবা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথ।
তাই আসুন, আমরা সবাই বন্যা ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই। খাদ্য, বস্ত্র, অর্থ, শ্রম, সময় কিংবা আন্তরিক দোয়া- যে যেভাবে পারি সহযোগিতা করি।
মনে রাখতে হবে, আজ আমরা অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ালে, কাল আমাদের বিপদের সময় আল্লাহতায়ালা তার অশেষ রহমত ও সাহায্য দিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়াবেন।