চিফ রিপোর্টার:: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ লাইন্সে উচ্চশব্দে গানবাজনা বন্ধ করার অনুরোধকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও স্থানীয় একটি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে তর্কাতর্কি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ ও ছররা গুলি চালালে শিক্ষার্থী ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহরের পশ্চিম মেড্ডার পুলিশ লাইন্স এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এর পরদিন বুধবারে (১৯ আগস্ট) দেশের বিভিন্ন ইসলামি ও রাজনৈতিক দল এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে পৃথক পৃথক বিবৃতি দিয়েছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ১৯ আগস্ট জামিয়া দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া মাদরাসার আবাসিক পরীক্ষা ছিল। কিন্তু ১৮ আগস্ট গভীর রাতে পুলিশ লাইন্সের ভেতরে উচ্চশব্দে বক্স বাজিয়ে গানবাজনা ও উল্লাস করায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছিল। শিক্ষার্থীরা একাধিকবার বিষয়টির সমাধান চেয়ে এবং পরবর্তীতে উচ্চশব্দ কমানোর অনুরোধ নিয়ে পুলিশ লাইন্সে গেলে কর্তব্যরতদের সঙ্গে বাদানুবাদ হয়। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।
তবে জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে অনভিপ্রেত এবং ভুল বোঝাবুঝির ফল বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গভীর রাতে উচ্চশব্দে গানবাজনা করা সমীচীন হয়নি, তবে পরিবেশ শান্ত করতেই পুলিশ পদক্ষেপ নেয়।

ইসলামি দলগুলোর তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতির নিরপেক্ষ তদন্ত ও পুলিশি আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক ইসলামি ও রাজনৈতিক দল পৃথক পৃথক বিবৃতি দিয়েছে। দলগুলোর দাবি, পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় অতিমাত্রায় শব্দদূষণের প্রতিবাদ জানাতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের শাস্তি এবং আহত শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসার দাবি জানিয়ে সংগঠনগুলোর দেওয়া সম্পূর্ণ বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া নিচে তুলে ধরা হলো:
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, পরীক্ষার্থী শিক্ষার্থীরা কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে নয়, পরীক্ষার প্রস্তুতির স্বার্থে উচ্চশব্দে গানবাজনা বন্ধ বা সাউন্ড কমানোর অনুরোধ জানাতে সেখানে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের কথা শোনার পরিবর্তে পুলিশের একটি অংশ নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও ছররা গুলি নিক্ষেপ করেছে। এতে কিশোর ও শিশু শিক্ষার্থীসহ অনেকে আহত হয়েছে। পুলিশের এমন ন্যাক্কারজনক আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রতি আনুগত্যশীল কোনো গোষ্ঠী এখনও সক্রিয় আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করতে হবে। দায়ী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে দ্রুত বরখাস্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বে থাকা পুলিশ লাইনের ইনচার্জের ভূমিকা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তিনি আহত শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসা ও ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি
দলের মহাসচিব মাওলানা মূসা বিন ইযহার এক বিবৃতিতে বলেন, উচ্চশব্দে গানবাজনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে মাদরাসাছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ এবং পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সমাধান সংলাপ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে না করে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগকারী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান জরুরি। সংঘাতের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, শিক্ষার্থীদের ওপর কী ধরনের বলপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ কতটা আইনসঙ্গত ছিল—তা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে জাতির সামনে স্পষ্ট করতে হবে। মাদরাসাছাত্রদের জীবন, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকার সমান। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অভিযোগের জবাব যদি লাঠি ও গুলিতে দেওয়া হয়, তবে তা রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
জাতীয় ইমাম পরিষদ
সংগঠনের সভাপতি মুফতী আবদুল্লাহ ইয়াহইয়া গভীর ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, পুলিশ লাইনের পাশে উচ্চশব্দে বক্স বাজিয়ে ডিজে গান-বাজনা ও আনন্দ উল্লাসের কারণে পরীক্ষারত জামিয়া দারুল আরকাম আল ইসলামিয়ার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। বিষয়টি একপর্যায়ে এসপির মাধ্যমে অবহিত করা হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, রাত গভীর হওয়ার পর আবাসিক পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনার স্বার্থে শব্দ বন্ধের অনুরোধ জানালে শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে গুরুতর আহত করা হয়। এ ঘটনায় মাদরাসা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত করতে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, হামলার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে পরীক্ষারত শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তিনি।
ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি রিদওয়ান মাযহারী বলেন, বুধবারে মাদরাসায় পরীক্ষা থাকায় মঙ্গলবার গভীর রাতে পুলিশ লাইন্সের ভেতরে উচ্চশব্দে গানবাজনার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটছিল। এ অবস্থায় মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী উচ্চস্বর কমানোর অনুরোধ জানাতে গেলে তাদের সঙ্গে পুলিশের বাদানুবাদ হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করা অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। একটি সামান্য ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আহত করার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে প্রশাসনের আরও দায়িত্বশীল, সংযত ও পেশাদার হওয়া প্রয়োজন। ফ্যাসিবাদী আমলের দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাচারী মানসিকতার কিছু প্রবণতা এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দৃশ্যমান। পুলিশ সুপার ঘটনাটিকে অনভিপ্রেত ও ভুল বোঝাবুঝির ফল বললেও তা শুধু বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিরপেক্ষ তদন্ত করা উচিত। একই সাথে সংগঠনটি আহতদের সুচিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং মাদরাসা ও মসজিদের নিকটবর্তী এলাকায় উচ্চশব্দে গানবাজনা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানায়।
