আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বছরের পর বছর ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি থেকেও অনেক ফিলিস্তিনি এক অভিনব উপায়ে বাবা হয়েছেন। কঠোর নিরাপত্তা ও নজরদারি এড়িয়ে গোপনে কারাগার থেকে নিজেদের শুক্রাণু বাইরে পাঠিয়ে স্ত্রীদের মাধ্যমে তারা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। তবে ২০২৫ সালের ইসরায়েল-হামাস বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুক্তি পেলেও, এই মুক্ত ফিলিস্তিনিদের অনেকের জন্যই স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়নি। মুক্তির পর তাদের নিজ জন্মভূমি পশ্চিম তীর বা গাজায় ফিরতে না দিয়ে সরাসরি মিশরে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের স্ত্রী ও সন্তানরা পশ্চিম তীরেই অবরুদ্ধ রয়ে গেছেন।
মূলত, ইসরায়েল-হামাস বন্দিবিনিময় চুক্তির একটি অন্যতম কঠিন শর্ত ছিল—দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত কয়েকজন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হলেও তারা কোনোভাবেই নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরতে পারবেন না। এই শর্তের অংশ হিসেবেই তাদের প্রথমে মিশরে এবং পরবর্তীতে তৃতীয় কোনো নিরাপদ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে কারাগারের বন্দিদশা থেকে মুক্তি মিললেও পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে অনেকের।
ছবি আর ফোনেই সীমাবদ্ধ বাবার ভালোবাসা
পাঁচ বছর বয়সি আকরাম ও দুই বছরের শিশু জুলিয়া তাদের বাবা আমজাদ আল-নাজ্জারকে চেনে শুধু ছবি আর স্ক্রিনের ফোনকলের মাধ্যমে। আমজাদ ইসরায়েলি কারাগারে দীর্ঘ ১০ বছর বন্দি থাকাকালে গোপনে পাচার করা শুক্রাণুর মাধ্যমে এই দুই সন্তানের জন্ম হয়। কারাগারের কঠোর সাক্ষাৎ নীতির কারণে জীবদ্দশায় তিনি কখনোই সন্তানদের ছুঁয়ে দেখতে পারেননি। ২০২৫ সালে মুক্তি পেলেও শর্ত মেনে তাকে মিশরে নির্বাসিত করা হয়। অন্যদিকে তার স্ত্রী ও সন্তানরা থেকে যান পশ্চিম তীরে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে আমজাদ আল-নাজ্জার বলেন, “স্বাধীনতা পেলেও পরিবারের সঙ্গে দেখা না হওয়ায় সেই আনন্দ পুরোপুরি অপূর্ণ থেকে গেছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “কারাগারে থাকা অবস্থায় বাবা হওয়া ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। সন্তানদের জন্মের সুসংবাদ পেলেও তাদের বুকে টেনে নেওয়া বা প্রথম কান্নার মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার কোনো সুযোগ আমার ভাগ্য জুটেনি।”
পর্দার ওপারে বাবার সঙ্গে প্রথম পরিচয়
একই রকম এক বাস্তবতার মুখোমুখি ১০ বছর বয়সি ফিলিস্তিনি শিশু বুশরা। তার জন্মও হয়েছিল কারাগার থেকে পাচার করা শুক্রাণুর মাধ্যমে। তার বাবা আহমেদ হামেদ দীর্ঘ ২২ বছর ইসরায়েলি কারাভোগের পর বন্দিবিনিময়ে মুক্তি পান, তবে তাকেও স্থানান্তরিত করা হয় মিশরে। বুশরার মা ইনাস স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে একাধিকবার কায়রো যাওয়ার আইনি অনুমতি চাইলেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে দীর্ঘ চেষ্টা শেষে বুশরা তার ফুফুর সঙ্গে মিশরে গিয়ে বাবার দেখা করতে সক্ষম হলেও, পশ্চিম তীরে ফেরার পর তাদের ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। মুক্ত হয়েও এই ফিলিস্তিনি পিতারা এখন নিজ দেশে পরবাসী, আর তাদের সন্তানরা কাটাচ্ছে এক অদৃশ্য পিতৃহীন জীবন।
টিএইচএ/
