বান্দরবান প্রতিনিধি :: বান্দরবানের ৭০% ডুবে গেছে। বানের পানিতে প্লাবিতে হয়ে গেছে এসব এলাকা। টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস ও জলাবদ্ধতায় বান্দরবান জেলায় ব্যাপক দুর্যোগের সৃষ্টি হয়েছে। এবারে বন্যায় জেলায় ৭০ শতাংশ এলাকায় প্লাবিত বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টায় জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে চলমান বন্যা পরিস্থিতি বিষয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস।
প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রশাসক বলেন, গত ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত জেলাজুড়ে মোট ৫৮১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত জেলায় ৪৯টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বড় আকারের ১১টি ভূমিধসে বিভিন্ন সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভূমিধসে লামা উপজেলায় ছয় জন এবং পানিতে ডুবে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্যোগে জেলার প্রায় ১২ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বান্দরবান পৌরসভা, লামা পৌর এলাকা ও সদর উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার মোট ৩৪টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ৬৫ কিলোমিটার এবং এলজিইডির প্রায় ৯০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া চারটি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে একটি সচল করা হয়েছে এবং বাকি তিনটির সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে জেলার ১৬৭টি সেতু ও ৩৭টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
বর্তমানে জেলার ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৬৭টিতে মানুষ অবস্থান করছে। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণাধীন ভবনেও দুর্গত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষের সংখ্যা ২ হাজার ৫৮২ জন।
কৃষি খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ২ হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি ও বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে ৩৬৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ৫ হাজার ২০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন সরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনীর লাইফবোট ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে উদ্ধার এবং ৮২৩ জনকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৪০০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ৮৫ হাজার ৬৫০ ব্যাগ শুকনো খাবার ও ৫৭৫ প্যাকেট শিশুখাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার দুর্গত মানুষের জন্য রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৩ লাখ টাকা নগদ সহায়তাও বিতরণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, এবারে বন্যায় জেলায় ৭০ শতাংশ এলাকায় প্লাবিত হয়েছে। তবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরুপন করা হয়নি। পরবর্তীতে সব তথ্য সংগ্রহের পর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, পানি নেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জীবাণুনাশক ছিটানো, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা জোরদার, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সংস্কার এবং কৃষকদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
