কাবুলের আকাশে হেলিকপ্টারের শব্দ নতুন কিছু নয়। দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধ আফগানদের কাছে এই শব্দের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল ভয়, সামরিক অভিযান, গোলাগুলি আর মৃত্যুর স্মৃতি। আকাশে সামরিক হেলিকপ্টার দেখা গেলে একসময় নিচে থাকা মানুষের মনে স্বস্তির চেয়ে শঙ্কাই তৈরি হতো বেশি।
কিন্তু সময় বদলেছে। একই আকাশে এখন দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। হেলিকপ্টার থেকে সামরিক পোশাকে সজ্জিত সদস্যরা স্তূপ করে রাখা লাল ফুলের গোছা ছুড়ে দিচ্ছেন নিচে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়া সেই ফুল ধীরে ধীরে নেমে আসছে কাবুল শহরের ওপর।
নিচের দৃশ্যটাও অন্যরকম। রাস্তাজুড়ে পড়ে আছে লাল ফুল ও পাপড়ি। কোথাও শিশুরা সেগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছে, কোথাও তরুণরা হাতে তুলে নিচ্ছে ফুলের গোছা। কয়েক দশক ধরে যুদ্ধের খবর দিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠা শহরটির জন্য দৃশ্যটি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
একসময় আফগানিস্তানের আকাশে সামরিক হেলিকপ্টারের উপস্থিতি মানেই ছিল যুদ্ধের স্মৃতি। বোমা, রকেট, সামরিক অভিযান আর সংঘর্ষের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সেই দৃশ্য। এবার সেই সামরিক হেলিকপ্টার থেকেই ঝরছে ফুল।
এই দৃশ্য তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপনের অংশ নয়। আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এর মধ্যে একটি গভীর প্রতীকী অর্থও খুঁজে পাওয়া যায়। যে আকাশ একসময় আতঙ্কের প্রতীক ছিল, সেই আকাশ থেকেই এখন মানুষের দিকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ফুল।
২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে কাবুলে এই আয়োজন করা হয়। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হেলিকপ্টার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে ফুল ছড়িয়ে দেয়। আফগান সংবাদমাধ্যম আরিয়ানা নিউজও হেলিকপ্টারের ভেতর থেকে ফুল ছোড়ার দৃশ্য প্রকাশ করেছে।
১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ২০২১ সালের এই দিনে আমেরিকা ও ন্যাটোর প্রায় দুই দশকের সামরিক উপস্থিতির শেষ পর্যায়ে ইমারাতে ইসলামিয়া কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর দ্রুত বদলে যায় দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি। পাঁচ বছর পর একই তারিখ ঘিরে কাবুলসহ বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় নানা কর্মসূচি।
কাবুলের আকাশ থেকে ফুল ছড়ানোর দৃশ্যটি সেই আয়োজনেরই একটি অংশ। তবে দৃশ্যটি চোখে আটকে থাকার কারণ অন্য জায়গায়।
হেলিকপ্টার আছে, সামরিক পোশাকও আছে, নিচে সেই কাবুল শহরই আছে। শুধু বদলে গেছে হেলিকপ্টার থেকে নিচে নেমে আসা জিনিসটি।
এবার বোমা নয়, ঝরছে ফুল। বোমাগুলো একদিন ফুল হয়ে ফুটুক, হয়তো কাবুলের আকাশ সেই প্রার্থনারই একটি উত্তর।
