207
মুফতি ইমাম মোঃ রেযাউল কারীম বুরহানী >>>
বাংলাদেশ একটি ধর্মীয় বৈচিত্র্যের দেশ। এখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ যুগ যুগ ধরে মিলেমিশে বসবাস করছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এসেছে—অন্য ধর্মাবলম্বীদের পূজা-উপাসনার সময় মাইক ব্যবহার করে বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাবে না, মসজিদ-মাদরাসার মাইক ব্যবহারে সংযম প্রদর্শন করতে হবে। এই নির্দেশনা নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; বরং তা আমাদের জন্য কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষাকে পুনরায় স্মরণ করার একটি সুযোগ।
কুরআনের নির্দেশনা: ন্যায় ও সদাচরণ
ইসলাম সর্বদা ন্যায়বিচার ও সদ্ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
“যারা তোমাদের সঙ্গে দ্বীনের কারণে যুদ্ধ করেনি এবং যারা তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করেনি—তাদের সঙ্গে তোমরা সদ্ব্যবহার করবে ও ন্যায়বিচার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।” (সূরা আল-মুমতাহিনা: ৮)
অতএব, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হলেও তাদের সঙ্গে শান্তি ও ন্যায় বজায় রাখা ইসলামের শিক্ষা। এটি কোনো সামাজিক সমঝোতার ফসল নয়; বরং সরাসরি আল্লাহর হুকুম।
নবী করীম সা. এর বাস্তব দৃষ্টান্ত
রাসূল সা. মদীনায় হিজরতের পর ইহুদি, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি করেছিলেন, যা “মদীনা সনদ” নামে পরিচিত। সেখানে প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে তাদের নিজস্ব ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল—“তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আমাদের ধর্ম আমাদের জন্য।” (সীরাত ইবনে হিশাম)
এটি শুধু সহনশীলতার দলিল নয়; বরং একটি রাষ্ট্রীয় সংবিধান ছিল, যা বহুধর্মাবলম্বী সমাজে শান্তি ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার অনন্য উদাহরণ।
শব্দ নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা
আজকের বিশ্বে শব্দদূষণ একটি বড় সামাজিক সমস্যা। অথচ কুরআন আমাদেরকে শত শত বছর আগে শিক্ষা দিয়েছিল—
“তুমি নামাজে খুব জোরে আওয়াজ করো না, আবার খুব আস্তেও নয়; বরং মাঝামাঝি একটি পথ অবলম্বন করো।” (সূরা আল-ইসরা: ১১০)
এ আয়াত প্রমাণ করে, ইবাদতেও শিষ্টাচার জরুরি। আমাদের নামাজ, আজান বা কুরআন তিলাওয়াত অন্যের কষ্টের কারণ হলে তা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা-বিরোধী হয়ে যাবে।
প্রতিবেশীর অধিকার ও সামাজিক সম্প্রীতি
রাসূল সা. বলেন—
“জিবরাইল আ. আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বেশি তাগিদ দিয়েছেন যে, আমি ভেবেছিলাম প্রতিবেশীকেও উত্তরাধিকারী বানানো হবে।” (বুখারি ও মুসলিম)
এ হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়—প্রতিবেশী যদি ভিন্ন ধর্মেরও হন, তাদের অধিকার রক্ষা করা মুসলমানের ঈমানের অঙ্গ। অযথা শব্দ সৃষ্টি করে প্রতিবেশীকে বিরক্ত করা সুন্নাহ-বিরোধী আচরণ।
আমাদের করণীয় কী?
১. মসজিদের মাইক ব্যবহারে সংযম ও নিয়ম মেনে চলা।
২. অন্য ধর্মাবলম্বীদের উৎসব বা উপাসনার সময় বিরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখানো।
৩. ইসলামি ভ্রাতৃত্ব, সহনশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা রাখা।
৪. তরুণ প্রজন্মকে ধর্মীয় সম্প্রীতির শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক অঙ্গীকার হলো—“সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার।” ইসলামও এই নীতির ভিত্তি শিক্ষা দেয় বহু আগে থেকেই। আজ যখন সামাজিক অস্থিরতা, উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন ধর্মীয় সম্প্রীতির ইসলামী শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সরকারের নির্দেশনাকে তাই প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা ভেবে সীমাবদ্ধ না রেখে, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নিজেদের আত্মসমালোচনা ও শুদ্ধাচরণের অংশ করে নেওয়া দরকার।
আমরা যদি ইসলামের এই শান্তির দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তব জীবনে ধারণ করি, তবে সমাজ হবে সম্প্রীতির, রাষ্ট্র হবে স্থিতিশীল, আর বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর কাছে প্রকৃত অর্থে “ধর্মীয় সম্প্রীতির মডেল” হিসেবে পরিচিত হবে।
এনএ/