মাহমুদুল হাসান রাশাদী >>
বাংলাদেশ—আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহে এমন এক উর্বর ভূমি, যেখানে আলেমদের ইলম যুগে যুগে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের প্রতিটি কোণে মাদরাসা, মসজিদ ও ওয়াজ-মাহফিলের জোয়ার; কিন্তু এই দীপ্তিময় বাস্তবতার অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক সূক্ষ্ম সংকট—লকবের প্রতিযোগিতা। আজ যদি কোনো বক্তা সুন্দর কণ্ঠে মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে দেন, সঙ্গে সঙ্গেই তার নামের আগে যুক্ত হয়—‘আল্লামা’, ‘শায়খুল হাদীস’, ‘মুফতি আজম’ ইত্যাদি উপাধি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই খেতাবের পেছনে কতটুকু ইলম, ইখলাস ও বিনয় নিহিত আছে?
ইলমের আসল সৌন্দর্য : বিনয় ও চরিত্রে
ইলমের মহিমা কখনো নামের জৌলুসে নয়, বরং বিনয়ে, চরিত্রে ও আমলে। প্রকৃত আলেমে দ্বীন তারা, যারা নীরবে সমাজে খেদমত করেন, সত্য লিখেন, গবেষণায় গভীরতা আনেন, কিন্তু নিজের মুখে কখনও বলেন না—‘আমি আল্লামা’; বরং তাঁরা বলেন, ‘আমি তো এক সামান্য ছাত্র, দীন শেখার পথে পথিক।’
ইতিহাসে আমাদের পূর্বসূরী ইমামগণ—ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদ (রহিমাহুমুল্লাহ)— কেউই নামের আগে খেতাব লাগাননি। তাঁদের পরিচয় ছিল জ্ঞানে, বিনয়ে ও আমলে। মুখে ছিল হিকমত, জীবনে ছিল জ্যোতি। দেওবন্দ ও বাংলাদেশের উলামায়ে কেরামের অনেকেই এই আদর্শের ধারক—মাওলানা রশীদ আহমদ গঙ্গহী রহ., মাওলানা কাসেম নানুতবী রহ., মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী রহ., সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ., মুজাহিদে আজম মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ., মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী রহ., মুফতি তাকী উসমানী দা.বা.— এঁরা কেউ লকবের মোড়কে নিজেকে সাজাননি; তবু তাঁদের ইলম, আমল ও তাকওয়া আজও আলোকিত করে রেখেছে উম্মতকে। তাঁদের কণ্ঠে নয়, চরিত্রেই দীন কথা বলেছে। নামের আগে নয়, বরং দুআর আড়ালে মানুষ হাত তুলে বলেছে—‘হে আল্লাহ! এই মানুষটিকে হেদায়াত দাও, কবুল করে নাও।’
জামিয়া প্রতিষ্ঠার জোয়ার : সংখ্যা বাড়ছে, মান হারাচ্ছে
আজ বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও ‘জামিয়া’, ‘দারুল উলূম’ ও ‘আল জামিয়া ইসলামিয়া’ নামে দাওরায়ে হাদীস মাদরাসার বিস্তার ঘটেছে। একসময় দাওরায়ে হাদীস ছিল অল্প কিছু বড় জামিয়ার পরিচয়চিহ্ন; এখন তা সর্বত্র। তবে এই প্রাচুর্যের ভেতরেই প্রশ্ন জাগে—কতটি জামিয়া মানসম্পন্ন? কতটিতে শায়খদের দরস ও তাদরিবে আছে আন্তরিকতা, ছাত্রদের মাঝে আছে ইলমের তৃষ্ণা ও তাকওয়ার সৌরভ? দুঃখজনকভাবে এখন অনেক জায়গায় ‘জামিয়া’ নাম আছে, কিন্তু মান নেই; সংখ্যা আছে, আত্মা নেই।
চাকরিচ্যুতির পরে জামিয়া উদ্যোগ
একটি সামাজিক বাস্তবতা হলো—কোনো শিক্ষক যদি বড় মাদরাসা থেকে চাকরিচ্যুত হন বা পদচ্যুত হন, অনেক সময় তিনি নিজের বাড়ি বা ভাড়া করা জায়গায় নতুন দাওরায়ে হাদীস মাদরাসা খুলে ফেলেন। চারপাশের তরুণ আলেমরা এসে কেউ হন ‘শায়খুল হাদীস’, কেউ ‘মুহাদ্দিস’, কেউ ‘মুফতি’। যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়—কে বেশি কালেকশন তুলতে পারে! ফল—মাদরাসা বাড়ছে, কিন্তু ইলমের মান কমছে। কাঠামো আছে, কিন্তু রূহানিয়াত নেই; ভবন আছে, কিন্তু বুনিয়াদ দুর্বল।
মানের অবক্ষয় ও ইখলাসের সংকট
এই অবক্ষয়ের মূলে আছে ইখলাসের অভাব, যোগ্যতার ঘাটতি ও তালীমের অনীহা। অনেক তরুণ আলেম দাওরায়ে হাদীস শেষ করেই মনে করেন—‘এখন আমি পূর্ণ আলেম, শেখাবো, মাদরাসা চালাবো।’ কিন্তু তারা আর গবেষণায় ডুব দেন না, কিতাবের গভীরে যান না। পদ, লকব, জনপ্রিয়তার মোহে তারা হারিয়ে ফেলেন ইলমের তপস্যা ও আমলের মাধুর্য। ফলে দাওয়াতের অঙ্গনে রূহানিয়াতের বদলে ঢুকে পড়েছে পেশাদারিত্ব।
হক্কানিয়াতের দায়িত্ব ও আমাদের দায়
আমরা ভুলে গেছি—হক্কানি আলেমের দায়িত্ব শুধু পড়ানো নয়, বরং সমাজে যোগ্য, আমলদার ও বিনয়ী দাঈ তৈরি করা। কিতাব মুখস্থ করানোই শিক্ষা নয়; শিক্ষা মানে চরিত্র গঠন, আমল সৃষ্টি এবং দীনি দায়িত্ববোধ জাগানো। আজ সাধারণ মুসলমানদের সন্তানদের যোগ্য ‘আলিমে দ্বীন’ হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের উপর ফরজে কিফায়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আমরা সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছি না। যেখানে আলেমদের হওয়া উচিত ছিল ইলমের বাতিঘর, সেখানে অনেকেই হয়ে যাচ্ছেন মাদরাসা পরিচালনার হিসাবরক্ষক। আর দাওয়াত ও তালীমের অঙ্গনে রূহানিয়াতের বদলে পেশাদারিত্ব ঢুকে পড়ছে।
আসল সমাধান — ইখলাস ও মেহনতের পুনর্জাগরণ
আমাদের দেশে এখন নতুন নতুন জামিয়া প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের দরকার সংখ্যা নয়, মানসম্পন্ন জামিয়া। দরকার যোগ্য শিক্ষক, ইলমী তপস্যায় অভ্যস্ত মুহাক্কিক শায়খগণ, যারা ছাত্রদের অন্তরে আল্লাহভীতি ও দীনি চেতনা সঞ্চার করবেন। আমাদের প্রয়োজন এমন আলেম—যারা নামের নয়, কাজের আলেম; যাদের চোখে থাকবে দয়া, মুখে থাকবে দীন, আর হৃদয়ে থাকবে বিনয়।
ইলমের এই ময়দানে আমাদের পুনরায় ফিরতে হবে—বিনয়ের পথে, মেহনতের পথে, আর ইখলাসের পথে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে পরহেজগার।”
(সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মর্যাদা আসে না সাইনবোর্ডে, আসে তাকওয়ায়; সম্মান আসে না লকবে, আসে ইখলাসে; আর বারাকাত আসে না সংখ্যায়, আসে নেক নিয়তে।
মুফতির আধিক্য : লকবের জৌলুসে ইলমের অবমূল্যায়ন
আজ ইলমের ময়দানে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—‘মুফতি’ উপাধির অবমূল্যায়ন। প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে এখন একাধিক ‘মুফতি সাহেব’ পাওয়া যায়। একসময় এই খেতাব অর্জনের জন্য বছরাধিক অধ্যবসায়, গবেষণা ও মাশায়েখের তত্ত্বাবধান দরকার হতো। কিন্তু এখন দাওরায়ে হাদীস শেষ করেই কেউ কয়েক মাস বা এক বছরের কোর্স করে হয়ে যাচ্ছেন ‘মুফতি সাহেব’! প্রশ্ন হলো—তাদের ইলমের গভীরতা কতটুকু? ফতোয়ার মতো সূক্ষ্ম বিষয়ের জন্য তারা কতটা প্রস্তুত?
ইফতা এমন একটি আমানত, যার সঙ্গে শরীয়তের রায়, মানুষের জীবন ও দীন জড়িত। কিন্তু এখন ‘মুফতি’ শব্দটি যেন জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর ইলম ও তফাক্কুহের গভীরতা অনেকের কাছেই অজানা।
ইফতা বিভাগের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশে মানসম্পন্ন ইফতা বিভাগ হাতে গোনা কয়েকটি, যেখানে পুরনো কিতাব, গবেষণা ও তালীমের গভীরতায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে অনেক জায়গায় ‘ইফতা কোর্স’ শুধু নামেই চালু—বাসা ভাড়া নিয়ে, দুই-তিন শিক্ষক নিয়ে ‘গবেষণা একাডেমি’ গড়ে ওঠে। অল্প কিছু মাসের কোর্স শেষে ছাত্ররা ‘মুফতি’ লকব নিয়ে বেরিয়ে আসে। মানুষও তাদের যোগ্যতা যাচাই না করেই সম্মান দেয়, হাত চুমে, মুসাফাহা করে। ফল—‘মুফতি’ শব্দটির মর্যাদা সাধারণ মানুষের চোখে কমে যাচ্ছে, ইলমের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।
সম্মানহানির মূল কারণ
এই অবক্ষয়ের মূলে তিনটি বিষয়—ইখলাসের অভাব, ইলমী মেহনতের ঘাটতি ও লকবের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ। আমরা ভুলে গেছি—‘মুফতি’ কোনো উপাধি নয়, এটি এক বিশাল দায়িত্ব। ইমাম ইবনে সিরিন (রহ.) বলেছেন—
“এই ইলমই হলো দীন; সুতরাং দেখো, তোমরা কার কাছ থেকে তোমার দীন নিচ্ছ।”
যখন ফতোয়া দান জনপ্রিয়তার হাতিয়ার হয়ে যায়, তখন ইলমের মর্যাদা ক্ষীণ হয়, ফতোয়ার আমানত নষ্ট হয় এবং উলামাদের প্রতি সমাজের আস্থা কমে যায়।
বক্তা নয়, মুখলিস আলেমের প্রয়োজন
আজকের সমাজে এক নতুন প্রবণতা স্পষ্ট—যারা সুন্দর কণ্ঠে বক্তৃতা দিতে পারেন, আবেগ জাগাতে পারেন, জনসমাগমে জনপ্রিয়তা পান, তারাই এখন ‘আল্লামা’ বা ‘মুফতি’ উপাধিতে সম্বোধিত হচ্ছেন। অন্যদিকে, যারা নীরবে কিতাবের গভীরে ডুবে থাকেন, রাত জেগে গবেষণা করেন, আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার পথে জীবন কাটান—তারা থেকে যাচ্ছেন আলোচনার আড়ালে, পরিচয়ের বাইরে।
কিন্তু স্মরণ রাখা জরুরি—জনপ্রিয়তা কোনো আলেমের মর্যাদার মাপকাঠি নয়। কারণ ইলমের আসল মহিমা লুকিয়ে আছে তাকওয়ায়, আর আলেমের আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে ইখলাসে। যিনি ইলমকে জীবিকার উপায় নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় মনে করেন—তিনি-ই প্রকৃত ‘ওয়ারিসে নবী’। তাঁর কথা কম, কিন্তু প্রভাব গভীর; তাঁর পরিচয় লকবে নয়, আমলে; আর তাঁর ইজ্জত মানুষের মুখে নয়, আল্লাহর কাছে নির্ধারিত।
সমাজের করণীয় ও সংস্কারের আহ্বান
এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। আমাদের উচিত—
- ইফতা বিভাগে ভর্তি ও সনদ প্রদানে কঠোর মানদণ্ড স্থাপন করা;
- যোগ্য ও অভিজ্ঞ মুফতিদের তত্ত্বাবধানে নতুন মাদরাসা অনুমোদন দেওয়া;
- ‘ইফতা বিভাগ’, ‘ইফতা কোর্স’ বা ‘গবেষণা বিভাগ’ নামে অপসংস্কৃতি প্রতিরোধে উলামা বোর্ড গঠন করা।
যদি আজ আমরা নীরব থাকি, তাহলে কাল ‘মুফতি’ উপাধির মর্যাদা তুচ্ছ হয়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষ আলেমদের প্রতি আস্থা হারাবে।
আমাদের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন
আজ সময় এসেছে আয়নার সামনে দাঁড়ানোর—আমরা কাকে ‘মুফতি’ বলছি? কেন বলছি? আর তার যোগ্যতা কতোটুকু? এই প্রশ্নগুলো যতদিন না উলামা সমাজ নিজেদের অন্তরে স্থান দেবে, ততদিন ইসলামী শিক্ষার এই অবক্ষয় থামবে না। ইলমের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের ফিরতে হবে আত্মসমালোচনার দ্বারে—যেখানে উপাধি নয়, আমল কথা বলে; জনপ্রিয়তা নয়, ইখলাস জয়ী হয়; আর আলেমের আসল পরিচয় হয়—নবীর ওয়ারিস হিসেবে সমাজে নূর ছড়িয়ে দেওয়া।
উপসংহার
আল্লামা, মুফতি ও বক্তার আধিক্য কোনো গৌরব নয়, যদি তার সঙ্গে না থাকে মান, মেহনত, ইখলাস ও খোদাভীতি। আমাদের দরকার সংখ্যায় নয়, মানে ও গুণে বৃদ্ধি; লকবে নয়, চরিত্রে উন্নয়ন। ইলমের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে বিনয়ে, আর মুফতির আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে তাকওয়ায়। মর্যাদা আসে না লকবে, আসে তাকওয়ায়; সম্মান আসে না আত্মপ্রচারে, আসে ইখলাসে; আর বারাকাত আসে না সংখ্যায়, আসে নেক নিয়তে।
আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের এমন ইলম দান করেন, যা নাম বাড়ায় না—বরং দীনকে রক্ষা করে, আর আলেমদের বানান বিনয়ী, খোদাভীরু ও হক্কানি ওয়ারিসে নবী। আমিন।
হাআমা/
