মামুনুর রশীদের কর্মকাণ্ডে বিব্রত আলেমসমাজ

by hsnalmahmud@gmail.com

আতাউল্লাহ নাবহান মামদুহ >>

নিজের বিবাহসংক্রান্ত বিতর্কিত বক্তব্য ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা অভিযোগে ‘আইডিয়াল ম্যারেজ ব্যুরো’র প্রতিষ্ঠাতা  মামুনুর রশিদ কাসেমীকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তার বক্তব্য ও আচরণে বিব্রতবোধ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট আলেমরা।

বিজ্ঞাপন
banner

সম্প্রতি তিনি এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, ‘একসঙ্গে চার স্ত্রীর বেশি রাখা বৈধ নয়, তবে জীবনে ৮-১০টি বিবাহ হওয়া অন্যায় নয়।” পোস্টে তিনি বলেন, ‘যদি কারও একাধিক বিবাহ হয় এবং যৌক্তিক কারণে তালাক হয়, তাহলে সেটি কোনো অপরাধ নয়।’

এছাড়া তিনি বলেন, ‘এক সাথে চারটার বেশি রাখার অনুমতি নাই, কিন্তু জীবনে অনেকগুলো বিবাহ হতে পারে। ভালো স্ত্রী চারটা রাখবো মৃত্যু পর্যন্ত। কিন্তু এই ভালো মেয়ে পাইতে যায়া যদি একশটা চেঞ্চ করা লাগে, আমি একশটা চেঞ্জ করবো, তা আমার বাপকে বলে দিসি।’

মামুনের এসব বক্তব্যের পর সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এরই মধ্যে এক নারী ‘তামান্না হাতুন’ নামে ফেসবুকে দাবি করেছেন যে, তিনি মুফতি মামুনুর রশিদের তৃতীয় স্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, ‘গত এক বছর ধরে মৌখিকভাবে দশ হাজার টাকা কাবিনে আমাদের সংসার চলছিল। পরবর্তীতে মতবিরোধের জেরে তিনি আমাকে মুখে তালাক দেন, কিন্তু পরে আবার অবৈধভাবে সম্পর্ক চালিয়ে যান। এতে আমি গর্ভবতী হই। পরে আমাকে গর্ভপাত করতে বাধ্য করা হয়।’

ওই নারী আরও অভিযোগ করেন, ‘বাচ্চা নষ্ট হওয়ার তিন দিন পরই সে কুষ্টিয়ায় গিয়ে ১৩ বছরের এক কিশোরীকে বিয়ে করে। এ ঘটনায় আমি মামলা দায়ের করেছি।’

ঘটনার পর ইসলামী অঙ্গনে ক্ষোভ দেখা দেয়। সামাজিক মাধ্যমে বহু আলেম তার কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে ইসলামের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।

আলেমদের প্রতিক্রিয়া

বিশিষ্ট আলেম ও লেখক শরীফ মুহাম্মদ লিখেছেন, ‘প্রয়োজনে (প্রয়োজনের বিভিন্ন দিক থাকতে পারে) একের অধিক, সর্বোচ্চ চার পর্যন্ত বিয়ে করার (ঘরে রাখার) অনুমতি, ন্যায় ও ভারসাম্য রক্ষার শর্তে ইসলামে আছে। দাম্পত্য সম্পর্ক রক্ষা করা কঠিন কিংবা অসঙ্গত হলে তালাক/ডিভোর্স দেওয়ার বিধানও ইসলামে আছে।’

‘ইসলামে বিয়ের বিধানের সঙ্গে বেশ কিছু বিষয় লক্ষ্যণীয়ভাবে যুক্ত। বিয়ের জন্য সুন্দর পদ্ধতিতে প্রস্তাব, প্রস্তাব গ্রহণ, আকদ, ওলীমা, মহর-ধার্য-পরিশোধ, স্ত্রীর উপযোগী ও সুষম খোরপোশের দায়িত্ব গ্রহণ, সদাচারপূর্ণ দাম্পত্য, সন্তানের সুন্দর প্রতিপালন, বিয়ে ঘটিত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, ইত্যাদি। কিন্তু কেউ যখন বলে, চার স্ত্রী ঘরে রাখবো, ‘ভালো চার স্ত্রী ঘরে রাখার প্রয়োজনে বাছাই করার প্রয়োজনে ১০০ টি বিয়ে করবো এবং দরকারে ডিভোর্স দেবো’, তার অর্থ হলো, বিয়ে করে, শর্ট দাম্পত্য করে, পছন্দ না হলে ডিভোর্স দিয়ে দিয়ে স্ত্রী বাছাইয়ের কাজটা সে সম্পন্ন করবে। বিয়ে করে শয্যা যাপন করে বউ-বাছাই সম্পন্ন করার এই পদ্ধতি ইসলামের কোনো অনুশীলনে এবং বিধানে আছে বলে জানা নাই। এটা একটা নতুন ধারণা। বিগত দেড় হাজার বছরে ইসলামের রেফারেন্সে কেউ এমন ‘বহুবিবাহ ও বহুডিভোর্স’ পলিসি সামনে আনার কথা শুনি নাই।’ – উল্লেখ করেন তিনি

শরীফ মুহাম্মদ অভিযোগের সুরে বলেন, ‘অনেকেই নানা রকম লাম্পট্য করেছে। তার জন্য অনেক ছলচাতুরি এবং ভন্ডামিও করেছে। কিন্তু এটা সম্ভবত সম্পূর্ণ নতুন আইডিয়া; ‘চার বউ বাছাই ও পছন্দের জন্য শত বিয়ে শত ডিভোর্স’। এই লোকের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া দরকার। তার এই ‘তাজদিদি কাজ’ যদি সঠিক হয় তাহলে তাকে পদক পুরস্কার অবশ্যই দেওয়া উচিত। আর যদি ভণ্ডামি, বাটপারি ও লম্পট্য হয় তাহলে তাকে ‘শায়েস্তা’ করা দরকার। ইসলামের বিয়ে ও ডিভোর্সের নীতি বিধান নিয়ে ফাইজলামি করা এবং ইসলামবিরোধী দুষ্টচক্রের সামনে পরিহাসের উপাত্ত সরবরাহ করা তার লাম্পট্্যর চেয়েও ভয়ংকর জিনিস। সমাজে লম্পট হয়তো অনেক আছে, এমন জটিল লম্পট এখনো আসে নাই।’

লেখক শরীফ মুহাম্মদের মতে, ‘তার (মামুনুর রশীদ) মুহূর্মুহু বিয়ে করা ও ডিভোর্স দেওয়ার তুড়িমারা গল্পগুলো শুনলে বোঝাই যায় না, ইসলামে বিয়ের আগে থেকে নিয়ে দাম্পত্য, সন্তান, শিক্ষা, সদাচার এবং এভাবে মৃত্যু পর্যন্ত শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যের কত বিস্তারিত পর্যায় ও বিধানের বিন্যাস রয়েছে। এ এক অদ্ভুত ফ্যান্টাসির জগত সে তৈরি করেছে। যেন সকাল বিকাল বিয়ে, দুপুর রাতে ডিভোর্স। সবাই একটু ভাবুন এবং অগ্রসর হোন।’

মুফতি মুহিউদ্দিন কাসেমী বলেন, ‘চারটা ভালো স্ত্রী পাওয়ার আগপর্যন্ত বিয়ে করতেই থাকবে—এমন কথা সাইকো ছাড়া কেউ বলতে পারে না। আলেম সেজে ইসলামকে ঢাল বানিয়ে প্রতারণা করছে মামুনুর রশীদ ও তার সহযোগীরা। আলেম সমাজের উচিত তাকে বিচারের মুখোমুখি করা।’

লেখক ও অনুবাদক মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক মন্তব্য করেন, ‘মাসনা আন্দোলন’-এর নামে এই ব্যক্তি ইসলামকে কলঙ্কিত করছে। ক্রমাগত কুরআন-সুন্নাহর অপব্যাখ্যা দিয়ে ইসলামকে যৌনধর্মে পরিণত করছে। স্থানীয় আলেমদের এখনই তাকে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।’

আলেম-সাংবাদিক ফারুক ফেরদৌস বলেন, ‘যদি কেউ সত্যিই একশটা বিয়ে করতে চায়, তবে উপযুক্ত মোহর নির্ধারণ করতে হবে যেন কোনো নারী ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ইসলামের নামে সস্তা বিয়ের প্রচলন নারীদের জন্য ভয়াবহ।’

‘মামুনুর রশীদ কাসেমী যদি একশত বিয়ে করতে চায়, তাহলে ইসলামে তাকে বাঁধা দেওয়ার উপায় কী? মেয়েদের জুলুম থেকে রক্ষা করার উপায় কী? উপায় হলো উপযুক্ত মোহর। একটা মেয়ের বিয়ের মোহর এই অংকের হওয়া উচিত যেন স্বামী তালাক দিলে মেয়েটা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’ – বলেন ফারুক ফেরদৌস

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আলেমরা সুন্নতের নামে ভ্রান্ত মূল্যায়নে মোহরে ফাতেমির প্রচলন করে সমাজের একটা অংশের মেয়েদের নিরাপত্তার ক্ষতি করেছেন। তারা হাদিস প্রচার করেন যে, নবীজি (সা.) বলেছেন কম মোহরে বরকত হয়। কিন্তু সাথে এটা এড়িয়ে যান যে, মদীনায় দ্বিতীয় হিজরীতে মুসলমানদের অত অভাবের মধ্যেও নবীজির মেয়ের বিয়ের মোহর ছিল প্রায় দশ লক্ষ টাকা।’

ফেরদৌসের মতে, ‘কোনো পুরুষের যদি উপযুক্ত মোহর দিয়ে বদল করে করে একশটা বিয়ে করার সামর্থ্য থাকে, খায়েশ থাকে, সে একশ বিয়ে করুক। বিয়ের রাস্তা বন্ধ হলে সে অন্য কিছু করবে।’

অন্যদিকে অনলাইন ও অফলাইনে মুফতি মামুনুর রশিদের কর্মকাণ্ডে ইসলামী মহলে গভীর উদ্বেগ ও বিব্রতবোধ সৃষ্টি হয়েছে। আলেমরা মনে করছেন, তার কর্মকাণ্ড ইসলামবিরোধী গোষ্ঠীর হাতে ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অস্ত্র তুলে দিচ্ছে।
তারা দ্রুত তার বিরুদ্ধে ইসলামী নীতিমালা ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে মুফতি মামুনুর রশীদকে মঙ্গলবার রাত ৯ টা ৫৩ মিনিটে এসব কর্মকাণ্ডে আলেমসমাজের বিব্রতকর পরিস্থিতি সম্পর্ক অবগত ও এহেন বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222