গরুর মাংসের গুজবে পিটিয়ে হত্যা: ন্যায়বিচারের জন্য ভারতীয় পরিবারের লড়াই

by hsnalmahmud@gmail.com

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যে ২০১৫ সালে হিন্দু জনতার হাতে নিহত এক মুসলিম ব্যক্তির পরিবার বলছে, কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহারের পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে তারা ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন।

মোহাম্মদ আখলাক, তখন ৫০ বছর বয়সী – গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গুজবটি ছিল এমন- তিনি গরুর মাংস খেয়েছিলেন এবং মজুদ করেছিলেন। এই দাবি তার পরিবার এখনো অস্বীকার করে আসছে।

বিজ্ঞাপন
banner

ভারতে গরু জবাই একটি সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ, হিন্দুরা এই প্রাণীটিকে পবিত্র বলে মনে করে, যারা দেশের ১.৪ বিলিয়ন জনসংখ্যার ৮০%।

উত্তর প্রদেশ এমন ২০টি রাজ্যের মধ্যে রয়েছে, যেখানে গরু জবাই এবং গরুর মাংস বিক্রি ও খাওয়া নিষিদ্ধ করার কঠোর আইন রয়েছে।

রাজধানী দিল্লি থেকে ৪৯ কিলোমিটার দূরে দাদরিতে সংঘটিত এই হামলাটি ছিল ভারতে গরু সংক্রান্ত সহিংসতার প্রথম বড় এবং ব্যাপকভাবে প্রকাশিত ঘটনা। এর ফলে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল।

আখলাকের পরিবারের আইনজীবী বিবিসি হিন্দিকে জানিয়েছেন, ১৮ জনের বিরুদ্ধে খুন এবং দাঙ্গাসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। তারা সকলেই জামিনে আছেন।

এখন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর নেতৃত্বাধীন উত্তর প্রদেশ সরকার স্থানীয় আদালতকে ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছে।

গত মাসে দায়ের করা একটি আবেদনে সরকারি আইনজীবী যুক্তি দেন, অভিযুক্তদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সাক্ষীদের সাক্ষ্যে ‘অসঙ্গতি’ রয়েছে। এই যুক্তি দেখিয়ে আদালতকে মামলাটি বন্ধ করার অনুরোধ জানানো হয়।

আদালত আবেদনটি গ্রহণ করবে কি না, আগামী ১২ ডিসেম্বর সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

হত্যার পর আখলাকের পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। ছবি: সংগৃহীত

এই খবর আখলাকের পরিবারকে হতবাক করেছে। পরিবারটি বলেছে, তারা সরকারের আবেদনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত।

নিহতের ছোট ভাই জান মোহাম্মদ বিবিসি হিন্দিকে বলেন, ‘আমরা কখনো ভাবিনি যে, আমাদের ১০ বছরের লড়াই এভাবে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’

হত্যার পরপরই পরিবারটি গ্রাম ছেড়ে চলে যায় এবং আর ফিরে আসেনি।

মোহাম্মদ বলেন, ‘এখন, আমরা আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে আরও বেশি ভীত। এটা কি (মামলা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ) অপরাধীদের সাহস দেবে না?’

তিনি বলেন, ভাইকে হত্যার রাতটি তিনি কখনো ভুলবেন না।

২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫ – আখলাক তার ২২ বছর বয়সী ছেলে দানিশের সঙ্গে ঘুমাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই লাঠি, তরবারি এবং সস্তা পিস্তল নিয়ে একদল জনতা তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। পরিবারটির বিরুদ্ধে গরু জবাই করে খেয়ে ফেলার অভিযোগ আনা হয়।

পরিবারটি জানিয়েছে, পরে তারা জানতে পারে যে, একটি হিন্দু মন্দির থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল কেউ একটি গরু জবাই করে খেয়েছে। মূলত এরপর জনতা আক্রমণ করে।

অভিযুক্তরা ফ্রিজে কিছু মাংস খুঁজে পায়। পরিবারটি দাবি করে, এটি খাসির মাংস। প্রমাণ হিসেবে এটি ধরেও দেখানো হয়।

তবে কিছুতেই কিছু হয়নি। সহিংস নির্যাতনে আখলাক ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং তার ছেলে গুরুতর আহত হন।

এই মামলাটি ভারতে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। যদিও প্রাথমিকভাবে এক সপ্তাহের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তবে চার্জশিট দাখিল করতে তিন মাস সময় লেগে যায়।

আখলাকের মৃত্যুর কয়েকদিন পর ঘটনাটি নিয়ে কথা বলার জন্য অনেকেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করেছেন। ফেডারেল পর্যায়ে ক্ষমতায় থাকা কিছু বিজেপি সদস্যের বিরুদ্ধে আক্রমণকারীদের রক্ষা করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

আখলাক হত্যাকাণ্ডের পর ভারতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। ছবি: সংগৃহীত

বিজেপির এক নেতা এই হত্যাকাণ্ডকে ‘দুর্ঘটনা’ বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে আরেকজন বলেছেন, গরুর মাংস খাওয়া অগ্রহণযোগ্য।

পুলিশ তাদের প্রথম চার্জশিটে ১৫ জন প্রধান অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করেছে- যার মধ্যে একজন কিশোর এবং স্থানীয় বিজেপি নেতার ছেলেসহ ২৫ জন সাক্ষী রয়েছেন। পরে আরও চারজন অভিযুক্ত যুক্ত করা হয়। যার ফলে মোট অভিযুক্তের সংখ্যা ১৯ জনে দাঁড়ায়; একজন ২০১৬ সালে মারা যান।

গত মাসে উত্তর প্রদেশ সরকার যুক্তি দিয়েছিল, তদন্তের সময় আখলাকের পরিবারসহ সাক্ষীরা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন।

এতে উল্লেখ করা হয়েছে, আখলাকের স্ত্রী তার অভিযোগে প্রথমে ১০ জনের নাম উল্লেখ করেছিলেন, যেখানে তার মেয়ে শায়েস্তা ১৬ জনের এবং তার ছেলে দানিশ ১৯ জনের নাম উল্লেখ করেছিলেন।

আবেদনে বলা হয়েছে, ‘উভয় পক্ষ একই গ্রামে বসবাস করা সত্ত্বেও, সাক্ষীরা অভিযুক্তের সংখ্যা পরিবর্তন করেছেন।’

আখলাকের পারিবারিক আইনজীবী মোহাম্মদ ইউসুফ সাইফি বলেন, ঘটনার সময় ‘বিশৃঙ্খলা এবং বিভ্রান্তি’ দেখে এটা বোধগম্য যে, প্রতিটি সাক্ষীই সকলকে জড়িত থাকতে দেখেননি।

তিনি বলেন, ‘শুধু দেখার বিষয় হলো, যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ আছে কি না।’

সরকারি আইনজীবীদের আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশ অভিযুক্তদের কাছ থেকে পাঁচটি লাঠি, লোহার রড এবং ইট জব্দ করেছে। কিন্তু আখলাকের স্ত্রী তার অভিযোগে আগ্নেয়াস্ত্র বা তরোয়ারের যে বলেছেন, তার বিপরীতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র বা তরোয়াল পাওয়া যায়নি। কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল থেকে গরুর মাংস উদ্ধার করেছেন।

২০১৬ সালে আখলাকের পরিবারের বিরুদ্ধে ‘গোহত্যা’ আইনের অধীনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এটি এখনো উত্তর প্রদেশের একটি আদালতে বিচারাধীন। তবে পরিবারটি বারবার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সাইফি অভিযোগ করেছেন, ‘গোহত্যা’ মামলাটি পরিবারকে ‘চাপ দেওয়ার’ জন্য করা হয়েছিল। স্থানীয় পশুচিকিৎসা রিপোর্টে মাংসটি গরু নয়, ছাগলের বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

পরিবার যখন আদালতের রায়ের জন্য উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষা করছে, তখন তারা আশায়ও বুক বেঁধে আছে।

আখলাকের ভাই মোহাম্মদ বলেন, ‘আদালতের ওপর আমার এখনো আস্থা আছে। আমি বিশ্বাস করি একদিন ন্যায়বিচার হবে।’

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222