৩৬ নিউজ ডেস্ক:: জ্যৈষ্ঠের প্রচণ্ড রোদ আর ভ্যাপসা গরমের মধ্যে পঞ্চগড় সীমান্তের শূন্যরেখার ফসলি জমির সরু আইলে ৫৯ ঘণ্টা ধরে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন নারী-শিশুসহ ১০ জন মানুষ। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক ‘পুশ ইন’ চেষ্টার শিকার এই ভাসমান দলটিকে কোনো দেশই তাদের সীমান্তে প্রবেশ করতে না দেওয়ায় গত আড়াই দিন ধরে তারা খোলা আকাশের নিচে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন।
রোববার (৭ জুন) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় গিয়ে দেখা যায়, ফসলি জমির আইলে বৃষ্টির পানি জমে থাকার মাঝেই কেউ বসে আছেন, আবার কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। রাইফেল হাতে তাদের এক পাশে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং অপর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন বিএসএফের সদস্যরা।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৫ জুন ভোর পাঁচটা থেকে রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত টানা ৫৯ ঘণ্টা ধরে এই ১০ জন মানুষ খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। পুশ ইনের চেষ্টার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ, দুজন নারী ও তিনটি শিশু রয়েছে। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে সীমান্ত এলাকায় যখন তীব্র বজ্রবৃষ্টি হচ্ছিল, তখনও তারা বৃষ্টিতে ভিজেই সেখানে অবস্থান করছিলেন।
নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ বড়বাড়ি বিওপি সীমান্ত দিয়ে গত শুক্রবার ভোরে এই ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবির কঠোর নজরদারির কারণে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি।
সীমান্তের এই উত্তেজনা ও মানবিক সংকট নিরসনে এ পর্যন্ত দুই দফা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে বাংলাদেশের ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়ন ও ভারতের ৯৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার পর্যায়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিজিবির বড়বাড়ি বিওপি ও বিএসএফের সাকাতি ক্যাম্পের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে প্রথম পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে দুই দফার বৈঠক থেকেও কোনো সমাধান আসেনি।
এদিকে শূন্যরেখায় অবস্থান করা ১০ জনকে দেখতে বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে উৎসুক মানুষ ভিড় করছেন। রোদ-বৃষ্টির মধ্যে আটকে থাকা নারী ও শিশুদের এমন কষ্ট দেখে দ্রুত দ্বিপক্ষীয় সমাধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বড়বাড়ি এলাকার বাসিন্দা মো. জহিরুল হক বলেন, ‘তিন দিন ধরে ছোট বাচ্চাসহ মানুষগুলোর এমন কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগছে। এই রোদ আর গরমের মধ্যে আমাদের ছায়াতে থাকতেই কষ্ট হচ্ছে। তাহলে পানি জমে থাকা আইলের মধ্যে ওরা কীভাবে আছে?’
দক্ষিণ প্রধানপাড়া এলাকার বাসিন্দা রহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ওখানে থাকা বাচ্চাদের দেখে কান্না আসতেছে। এভাবে পানির ওপর রোদের নিচে মানুষ কতক্ষণ থাকতে পারে? ওদের খাবার নাই, প্রস্রাব-পায়খানার ব্যবস্থা নাই। আমরা চাই দুই দেশের সরকার আলোচনা করে দ্রুত এই ঘটনার সমাধান করুক। তা না হলে এভাবে তাদের ওখানে মারা যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হবে।’
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম রোববার বিকেলে বলেন, ‘আমি আজও ভারতের ৯৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ডারকে পুশ ইনের শিকার ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নিতে বলেছি। কিন্তু বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিতে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরাও অবৈধভাবে তাদের একসেপ্ট (গ্রহণ) করব না—সে বিষয়ে অনড় আছি। সেই সঙ্গে বিষয়টি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সেখান থেকে যে নির্দেশনা পাব, সেই অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
হাআমা/
