হাসান আল মাহমুদ >>
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাম্প্রতিক জামায়াতবিরোধী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কওমি অঙ্গন, ইসলামী দলগুলো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, হেফাজতের মতো একটি আস্থাভাজন অরাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় এই আলেমকে কি কোনো মহল নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে?
বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ‘জাতীয় উলামা কাউন্সিল’-এর আত্মপ্রকাশী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, ‘মওদুদীর ইসলাম আর আমাদের ইসলাম এক নয়। জামায়াতের ইসলাম মওদুদীর ইসলাম।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত বাংলাদেশে থাকতে পারবে না” এবং তাদের “নাস্তিকদের চেয়েও খাতরনাক” আখ্যা দেন।
এর আগেও গত ১৫ সেপ্টেম্বর এক বক্তব্যে তিনি দাবি করেছিলেন, জামায়াত সরকারে এলে কওমি, দেওবন্দি ও সুন্নিয়াত মাদরাসার অস্তিত্ব থাকবে না।
জামায়াতে ইসলামীর প্রতিবাদ
হেফাজত আমীরের এই বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে বলেন—
- হেফাজত আমীরের বক্তব্য “অসত্য, মনগড়া ও ভিত্তিহীন”
- কওমি, দেওবন্দি বা সুন্নিয়াত মাদরাসার বিরুদ্ধে জামায়াত কখনো অবস্থান নেয়নি
- ২০০১–০৬ সালে জামায়াতের দু’জন মন্ত্রী দায়িত্বে থাকাকালে দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই
- তিনি বলেন, “একজন বরেণ্য আলেমের মুখে এমন ভিত্তিহীন মন্তব্য শোভা পায় না।”
কওমি অঙ্গনে অসন্তোষ—‘এই ভাষা আকাবিরদের নয়’
হেফাজত আমীরের বক্তব্য নিয়ে কওমি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আলেমসমাজের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, আকাবিরগণ অতীতে মওদুদী মতাদর্শ নিয়ে সমালোচনা করলেও এ ধরনের কঠোর ও বিভাজনমূলক ভাষা ব্যবহার করেননি।
কওমি আলেম মুফতি মনোয়ার হুসাইন বলেন, হেফাজতের বয়োবৃদ্ধ মুরুব্বীকে ব্যবহার করে খ্যাত অখ্যাত কয়েকটি সংবাদমাধ্যম নিয়মিত ফটোকার্ড ছেড়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে স্বার্থ হাসিল করার কোশেশ চলছে। এখানে আকিদা, ইসলাম কিসু আছে বলে অনুমান করা যায় না। তবে এর পেছনে বিরাট বিনিয়োগ আছে বলে সন্দেহ করা হয়।
তারে মতে, দেখলাম হেফাজত আমীরকে দিয়ে বক্তব্য দেওয়ানো হচ্ছে অথবা ব্যক্তিগত কথা ব্যক্তিগত মতামতকে হেফাজতের আমীরের বরাত দিয়ে প্রকাশ করছে একটা চক্র।
কওমি শিক্ষাবিদ আলেম মুফতি সাঈদ আহমাদ বলেন, ‘আমিরে হেফাজতকে যারা ব্যবহার করছেন তাদের উচিত থেমে যাওয়া অথবা তার আশেপাশের সচেতন ব্যক্তিদের উচিত তাকে থামিয়ে দেয়া।’
‘তার প্রচারণা দ্বারা প্রতিপক্ষই লাভবান হচ্ছে। সাধারণ মানুষ তার কথাগুলোকে গ্রহণ করছে না। তার ভাষার ব্যবহার আলেমসমাজকে প্রশ্নের সম্মুখীন করছে। আর তিনি তার অবস্থান হারাচ্ছেন।’- বলেন তিনি
এই শিক্ষক বলেন, ‘আলেম সমাজের মেহনতের কারণে এদেশের সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ মওদুদীর ভ্রান্তির ব্যাপারে সতর্ক। বাংলাদেশ জামাত ইসলামের রাজনীতির এটা একটি মাইনাস পয়েন্ট।’
তার মতে, ‘আমিরে হেফাজত তার বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নাস্তিক এবং কাদিয়ানীদের সাথে তুলনা করে আলেম সমাজের যৌক্তিক বিরোধিতাকেই বরং প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। সমালোচনাতেও প্রয়োজন ইনসাফ।’
মুফতি মুহিউদ্দিন কাসেমী বলেন, বাবুনগরী সাহেব উলামা কাউন্সিলে এসে বললেন, জামায়াত সাহাবিদের দুশমন এবং নাস্তিকদের চেয়েও খারাপ। আর এদিকে মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের পিতা আল্লামা আজিজুল হক রহ. জামায়াতে অনুষ্ঠানে যেতেন, তাদের সঙ্গে জোট করেছিলেন।
তার মতে, ‘জামায়াতে ইসলাম বা মওদুদিয়াতের ব্যাপারে আমাদের আকাবিরগণ যে ভাষায় সমালোচনা করেছেন বা ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন, সে ভাষা ব্যবহার না করে জামায়াতকে নাস্তিকদের চেয়েও খারাপ বলা সুন্দর না। জামায়াততো অমুসলিম না। তাদের ভুলগুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরতে হবে।
তার মতে, জামায়াতের বিরোধিতা করতে হবে ন্যায়নিষ্ঠতার সাথে, ইনসাফের সাথে।
কওমি মাদরাসা শিক্ষক ওে লেখক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেন, হেফাজতের আমীর মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী সাহেব যে ভাষায় ও অভিধায় জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করছেন এগুলো কখনোই সমর্থনযোগ্য না। তিনি বয়োবৃদ্ধ মুরুব্বি হিসেবে হয়ত অনেকেই বিষয়টাকে চেপে যাচ্ছেন, কিন্তু এর কারণে দিনশেষে ক্ষতিটা কওমী আলেমদেরই হচ্ছে। মূলত এই জাতীয় লাগামছাড়া কথাবার্তা ও সমালোচনার কারণে যৌক্তিক সমালোচনাগুলোও গুরুত্বহীন ও মূল্যহীন হয়ে পড়ে। যারা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী সাহেবকে উস্কে দিচ্ছেন এসব কথা বলার জন্য, তারা অবচেতনে মূলত জামায়াতে ইসলামীকেই লাভবান করছেন।
কওমি মাদরাসা শিক্ষক মাওলানা তানযীল হাসান দীর্ঘ এক অভিজ্ঞতায় জানান, আমার নিজ বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা। গত কিছুদিন পূর্বে চট্টগ্রামে সফর যাওয়া হয়েছিল। সে সফরে বাবুনগর মাদ্রাসায় যাই এবং সৌভাগ্যবশত আমিরে হেফাজতের সাথে সাক্ষাৎ হয়। হুজুর যে কক্ষে মিটিং করেন সে কক্ষে হুজুরের সাথে দীর্ঘ সময় অবস্থান করার সুযোগ হয়। এই দীর্ঘ সময়ে হুজুরকে খুব কাছ থেকে দেখে আমাদের কাছে এটাই উপলব্ধি হয়েছে যে, আসলে হুজুর এখন বয়সের ভারে একেবারে নুব্জ। আমাদের অবস্থানকালীন সময়ে লক্ষ্য করলাম হুজুরের কথাবার্তা ও স্বাভাবিক কাজকর্মে অনেক অসংলগ্নতা ফুটে উঠছে। দেখলাম হুজুর মাঝে মাঝেই কোনো কারণ ছাড়াই হাসছেন আবার ছেলেমানুষের মতো কথাবার্তা বলছেন। হুজুরের সামনে এসে অনেকে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে ছবি ও সেলফি তুলছে। কেউ কেউ তো হুজুরের চেয়ারের হাতল ধরে একেবারে হুজুরের গা ঘেঁষে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে সেলফি তুলছিল।কিন্তু হুজুরের তেমন কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। হুজুর কিছুই বলছিলেন না বরং কোন কারন ছাড়াই মিটমিটিয়ে প্রায় সময় হাসতে থাকলেন। হুজুরের মতো এমন একজন নেতৃত্ব দানকারী ব্যক্তির সাথে যে কেউ যেনতেন ভাবে কথা বলবে, অসংলগ্ন আচরণ করবে, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে ছবি তুলবে সেলফি তুলবে? এটা তো আসলে কোন ভাবেই হতে পারেনা! যাহোক আমাদের কাছে মনে হল, বয়সের ভারে হয়তো হুজুরের কাছে এটা তেমন অস্বাভাবিক মনে হয়নি। দুঃখের বিষয় হলো জীবনের পড়ন্ত বেলায় আল্লামা আহমদ শফী রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ঠিক এভাবে নিজেদের হীন স্বার্থে ব্যবহার করার অপচেষ্টা করেছিল। ভয় হয় আমাদের এই সেরেতাজকেউ জীবনের পড়ন্ত বেলায় হয়তো কেউ কেউ নিজেদের কোন স্বার্থসিদ্ধি হাসিল করার জন্য ব্যবহার করে থাকতে পারেন। এটা অস্বাভাবিক নয়। আল্লাহতালা হেফাজত করুন এবং সবাইকে সহি বুঝ দান করুন। আমীন।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ: জমিয়তের দিকে আঙুল
সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই অভিযোগ তুলেছেন—বিএনপি ঘনিষ্ঠ দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নাকি হেফাজত আমীরকে জামায়াতবিরোধী বক্তব্য দিতে উৎসাহিত করছে। তাদের দাবি, বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জামায়াতকে দুর্বল করার লক্ষ্য থেকেই এসব উস্কানি।
তবে জমিয়তের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন— ‘এসব কথা সম্পূর্ণ অমূলক। হেফাজত আমীরের মত ব্যক্তিকে জমিয়ত ব্যবহার করার অধিকার রাখে না।
তিনি বলেন, জমিয়ত হেফাজতের আমীরকে ব্যবহার করছে বলে যারা অভিযোগ করছেন, তারাও পারলে নিজেদের পক্ষে হেফাজত আমীরকে ব্যবহার করে দেখাক। এটা কোনো মামুলি বিষয় নয়। হেফাজত আমীর নিজের বিশ্বাস ও চেতনা থেকেই জাতিকে জামায়াত সম্পর্কে সচেতনা করছেন।
অন্য দিকে হেফাজতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তারা জানান, হেফাজত আমীর যা করছেন বা বলছেন, তা তার সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যাপার। এতে দলীয় বক্তব্য না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংগঠনটির এক কেন্দ্রীয় নেতা ৩৬ নিউজকে জানান, হেফাজতে ইসলামের আমীর দেশের শীর্ষ আলেম, দেশের মুরব্বি। সে হিসাবে তিনি যে কারো ভুল ধরতেই পারেন। বলতে পারেন।
তিনি বলেন, হেফাজত আমীর এখন নয়, বহু আগে থেকেই জামায়াতের ভুলত্রুটি নিয়ে কথা বলে আসছেন। জামায়াতের উচিত তাদের ভুলগুলো সংশোধন করা।
হাআমা/
