তানবিরুল হক আবিদ (রিপোর্টার,৩৬ নিউজ)
মাদরাসাপড়ুয়া তরুণদের প্রযুক্তিমুখী করতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন প্রযুক্তিপ্রেমী আলেম ও হাফেজ মাহমুদুল হাসান মাসুম। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন আধুনিক একটি কম্পিউটার স্কুল, যা তরুণদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, অ্যাপ তৈরি ও ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি প্রযুক্তিচর্চার সমন্বয় ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে তিনি কথা বলেন ৩৬ নিউজ–এর সঙ্গে।
৩৬ নিউজ: আপনার কম্পিউটার স্কুল আজ বেশ পরিচিতি পেয়েছে। শুরুর গল্পটা জানতে চাই?
মাহমুদুল হাসান: শুরুটা একদম সাদামাটা ছিল। ২০২১ সালের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চে একটা ছোট্ট ঘর, মাত্র দুটো কম্পিউটার আর সামনে একটা সাধারণ সাইনবোর্ড দিয়ে যাত্রা শুরু করা। প্রথম ব্যাচে ছিল ১০-১২ জন শিক্ষার্থী। তখন স্বপ্ন ছিল অনেক বড়, কিন্তু কর্মপরিধি ছিল খুব কম। আল্লাহর রহমতে আজ এই প্রতিষ্ঠান থেকে অনলাইন-অফলাইন মিলিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বেসিক কম্পিউটার থেকে শুরু করে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইনসহ নানা কোর্স করছেন। যাঁরা আমাদের কাছ থেকে শিখেছেন, তাঁরা লাইফটাইম সাপোর্টও পাচ্ছেন।

৩৬ নিউজ: আপনি তো কওমি মাদরাসার ছাত্র ছিলেন। সেখানে ইলেকট্রনিক ডিভাইস, বিশেষ করে মোবাইল ব্যাবহার পর্যন্ত নিষিদ্ধ। এমন পরিবেশে কম্পিউটার শেখার আগ্রহ টিকিয়ে রাখলেন কীভাবে?
মাহমুদুল হাসান: এটা সত্যি চ্যালেঞ্জিং ছিল। ঢাকার মাদরাসাগুলোতে নিয়ম অত্যন্ত কঠোর। মোবাইল রাখা যেত না, কম্পিউটার তো দূরের কথা। কিন্তু ভেতরের টানটা এত প্রবল ছিল যে আমি হাল ছাড়িনি। পরিচিত একটা দোকানে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে কম্পিউটার নাড়াচাড়া করতাম, চালাতাম। প্রথম প্রথম শুধু কার্টুন দেখতাম। কিন্তু বাবা যখন বললেন, ‘শুধু টাইম পাস না করে কম্পিউটার দিয়ে বড় কিছু শেখা সম্ভব,’ তখন থেকেই মনোযোগ দিলাম ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক ডিজাইনের মতো বিষয়গুলোতে। বাবার অনুপ্রেরণা না পেলে হয়তো আজ এই জায়গায় আসতে পারতাম না।
৩৬ নিউজ: হাফেজ হওয়ার পর আপনার পড়াশোনা কেমন কেটেছে?
মাহমুদুল হাসান: হাফেজ হওয়ার পর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসি। প্রথমে মাদরাসা বাইতুল উলুম ঢালকানগরে ভর্তি হই। পরে জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া, যাত্রাবাড়ী থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করি। পুরো সময়টায় মাদরাসার কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যেই ছিলাম, কিন্তু সুযোগ পেলেই বাইরে গিয়ে কম্পিউটার চর্চা চালিয়ে যেতাম। এটাই ছিল আমার প্যাশন।
৩৬ নিউজ: কম্পিউটারের প্রতি আগ্রহের শুরুটা আসলে কবে থেকে?
মাহমুদুল হাসান: ছোটবেলা থেকেই। কম্পিউটার আমার কাছে যেন জাদুর বাক্স ছিল। কীভাবে একটা মেশিন এত কিছু করতে পারে, সেটা আমাকে মুগ্ধ করত। হাফেজ হওয়ার পর বাবা আমাকে একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার উপহার দেন। সেই দিন থেকেই আইটি জগতে আমার আসল যাত্রা শুরু হয়।
৩৬ নিউজ: মাদরাসার ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় করা এটা তো অনেকের কাছেই দুরূহ মনে হয়। এ ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?
মাহমুদুল হাসান: দেখুন, দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় জ্ঞান আমাদের জীবনের ভিত্তি, আর প্রযুক্তি হলো আজকের যুগের চাহিদা। আমি মনে করি, মাদরাসাপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের উচিত নিজের শিকড় ঠিক রেখে, ধর্মীয় জ্ঞানকে মজবুত রেখে প্রযুক্তিতেও দক্ষ হওয়া। ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে ইসলামকে সঠিকভাবে প্রচার করতে হলে তথ্য-প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা অপরিহার্য। আমি নিজে দুটো জিনিসের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পেয়েছি।
৩৬ নিউজ: আপনার প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার স্কুলের বিশেষত্ব কী?
মাহমুদুল হাসান: আমরা শুধু কোর্স করিয়ে ছেড়ে দিই না। আমাদের লক্ষ্য থাকে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করা। কোর্স শেষ হওয়ার পরও লাইফটাইম সাপোর্ট দিই আমরা। বেসিক থেকে শুরু করে অ্যাডভান্স লেভেল পর্যন্ত সব ধরনের কোর্স আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি নিজে ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে কাজ করি, তাই রিয়েল ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে।
৩৬ নিউজ: আপনাদের ভবিষ্যতে কী ধরনের পরিকল্পনা আছে?
মাহমুদুল হাসান: বড় স্বপ্ন আছে। ইনশাআল্লাহ শিগগিরই নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম চালু করব। এক বছরমেয়াদি উচ্চতর গ্রাফিক ডিজাইন কোর্স এবং বিশেষায়িত প্রযুক্তি বিভাগ খোলার পরিকল্পনা আছে। আমাদের মূল লক্ষ্য, দেশের লাখো তরুণকে দক্ষ করে তোলা এবং আইটি সেক্টরে তাদের কর্মসংস্থান তৈরি করা। প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন শুধু সার্টিফিকেট নিয়ে না ফেরে, বরং প্রকৃত দক্ষতা অর্জন করে এবং নিজের ক্যারিয়ার গড়তে পারে—এটাই চাই।
৩৬ নিউজ: যারা এখনো দ্বিধায় আছেন, যারা ভাবছেন প্রযুক্তি শেখা শুরু করবেন কি করবেন না তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন।
মাহমুদুল হাসান: আমি নিজে শূন্য থেকে শুরু করেছি। অধ্যবসায়, ধৈর্য আর পরিবারের সমর্থন থাকলে যে কেউ তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। আল্লাহর ইচ্ছায় অসম্ভবকে সম্ভব করা যায় এটা আমার নিজের জীবন থেকে বলছি। শুধু একটা জিনিস মনে রাখবেন, নিজের আইডেন্টিটি ধরে রাখুন। মাদরাসাপড়ুয়া হোন বা যেকোনো ব্যাকগ্রাউন্ডের, নিজের মূল শিকড়কে শক্ত রাখুন। সেটাই আপনার আসল শক্তি। আর হ্যাঁ, স্বপ্ন দেখুন বড়, কাজ করুন নিরলস সফলতা আসবেই ইনশাআল্লাহ।
এনআর/
