যেভাবে আলোচনায় এলো ১১ দলের নির্বাচনী সমঝোতা

by hsnalmahmud@gmail.com

হাসান আল মাহমুদ >>

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ১১ দলের একটি নির্বাচনী সমঝোতা। সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা একে ‘জোট’ নয়, বরং ‘নির্বাচনী সমঝোতা’ হিসেবে অভিহিত করলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখছেন।

বিজ্ঞাপন
banner

যেভাবে শুরু

প্রথমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি — এই আটটি দল সংস্কার, নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠন সংক্রান্ত কয়েকটি অভিন্ন দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে একমত হয়।

গত ডিসেম্বরে তারা বিভাগীয় সমাবেশ ও যৌথ কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেয়। এ সময় থেকেই নির্বাচনে আসন সমন্বয়ের আলোচনা শুরু হয়।

কেন জোট নয়, সমঝোতা

জামায়াতের সঙ্গে কওমি ধারার দলগুলোর আদর্শিক পার্থক্যের কারণে আনুষ্ঠানিক জোট গঠন না করে আসনভিত্তিক সমঝোতার পথ বেছে নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয়—

  • কেউ জোটপ্রধান হবেন না
  • সবাই নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করবেন
  • এক আসনে এক প্রার্থী থাকবে
  • এ কারণেই “সমঝোতা” শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

সমঝোতার বিস্তার

গত ৮ ডিসেম্বর খেলাফত মজলিসের কার্যালয়ে আট দলের বৈঠকে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর নিয়মিত বৈঠক চলতে থাকে। ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জানান— জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এলডিপি এবং পরে এবি পার্টি এই সমঝোতায় যুক্ত হয়েছে। ফলে শরিক দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১।

বর্তমান ১১ দল

এই সমঝোতায় বর্তমানে রয়েছে—জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, এবি পার্টি ও এলডিপি।

বিভিন্ন সময়ে দেয়া নেতাদের বক্তব্য

জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা নেতৃত্বের রাজনীতি করছি না, জাতীয় স্বার্থের রাজনীতি করছি।’ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, ‘এই সমঝোতার লক্ষ্য হচ্ছে ইসলাম, দেশ ও জনগণের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখা।’ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক বলেন, ‘এই সমঝোতা কোনো আপস নয়, বরং একটি ন্যায্য রাজনৈতিক প্রয়াস।’ এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে কাজ করব এবং জোটের বাইরে কোনো প্রার্থী দেব না।’

বিশ্লেষকদের অভিমত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এগারো দলের এই নির্বাচনী সমঝোতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভক্ত থাকা ইসলামপন্থি দলগুলো এবং নাগরিক ও সংস্কারমুখী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে এই সমঝোতা নতুন ধরনের পারস্পরিক সংযোগ ও বোঝাপড়ার ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যা আগে খুব একটা দেখা যায়নি।

‘এই সমঝোতা কেবল নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের একটি প্রয়াস। এর মাধ্যমে মতাদর্শগত ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও ন্যূনতম জাতীয় স্বার্থ, গণতন্ত্র, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে একসঙ্গে কাজ করার একটি নতুন নজির স্থাপিত হয়েছে।’ বলেন তারা

বিশ্লেষকরা আরো জানান, ইসলামপন্থি ধারার সামাজিক ভিত্তি এবং নাগরিক ধারার তরুণ ও শহুরে সমর্থন — এই দুই প্রবাহের মিলন এই সমঝোতাকে আরও বিস্তৃত ও প্রতিনিধিত্বশীল করে তুলতে পারে। এর ফলে এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব না করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে।

তাঁরা মনে করেন, আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও এই সমঝোতা যদি পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা ও আলোচনার সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে এটি ভবিষ্যতে আরও পরিণত ও টেকসই রাজনৈতিক সহযোগিতায় রূপ নিতে পারে। এই সমঝোতার সাফল্য ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতির পথ খুলে দিতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রার্থী চূড়ান্ত কখন

জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান আজ সোমবার (১২ জানুয়ারি) জানান, মঙ্গলবার বা বুধবার ১১ দলের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হবে। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “যেকোনো সময় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’

এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা ইউনুস আহমদ আজ সোমবার (সন্ধায়) ৩৬ নিউজকে বলেন, ‘আজ রাতেই একটা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেই চূড়ান্ত হবে আসন সমঝোতার বিষয়টি। আজকের এ বৈঠকটি সফল হলেই কালকে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে বলেও জানান তিনি।

সব মিলিয়ে এই সমঝোতা দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। এটি মাঠপর্যায়ে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে সাংগঠনিক শক্তি, ভোটার সাড়া এবং রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222