আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশটির শীর্ষস্থানীয় মুসলিম সংগঠন জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দ। নয়াদিল্লিতে সংগঠনের সভাপতি হযরত মাওলানা মাহমুদ আসাদ মাদানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির এক বিশেষ সভায় এই সংক্রান্ত একটি খসড়া প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট করেন যে, দেশটিতে চলমান ঘৃণা, বিভাজন এবং নিত্য নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিগত কয়েক বছরে ভারতের সরকারি অগ্রাধিকার এবং সামাজিক আচরণের নেতিবাচক পরিবর্তন শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় অংশের জন্যই উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং তা সমগ্র গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। উসকানিমূলক ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য সামাজিক পরিবেশকে ক্রমাগত দূষিত করছে। যে ধর্মীয় উগ্রবাদ একসময় সমাজের প্রান্তিক অংশে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন জাতীয় রাজনীতি এবং শাসকগোষ্ঠীর প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে। বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রীয় স্তরে এই বিদ্বেষ এখন ভীতিপ্রদর্শন-ভিত্তিক নোংরা রাজনীতির রূপ নিয়েছে। একটি সুসংগঠিত চিন্তাধারার অধীনে এই মহান গণতান্ত্রিক দেশের মূল সাংবিধানিক প্রকৃতি পরিবর্তনের অপচেষ্টা করা হচ্ছে, যেখানে বিচার বিভাগের একাংশের মনোভাবও ভূমিকা রাখছে।
জমিয়তের নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভারতের সংখ্যালঘুদের সম্মান, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ঐতিহাসিক মসজিদ, মাদ্রাসা এবং কবরস্থানগুলোকে ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। তুচ্ছ অজুহাতে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক নিপীড়ন অব্যাহত রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে এই গভীর অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছে যে, সেখানে কার্যত একটি ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ’ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়া নাগরিক পরিচয় এবং নাগরিকত্বের নামে সরকারের বিভিন্ন বিতর্কিত পদক্ষেপ লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিকের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দেশের সচেতন মহলে এমন একটি ধারণা ক্রমশ দৃঢ় হচ্ছে যে, এই রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টাগুলোর লক্ষ্য শুধু ভোটার তালিকা উন্নত করা নয়, বরং মুসলিম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে খর্ব করা। তবে গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ অর্থাৎ ভোটাধিকারের প্রতিই যদি সাধারণ মানুষের সন্দেহ ও অবিশ্বাস জন্মাতে শুরু করে, তবে তার পরিণতি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক হতে বাধ্য।
বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী যুবসমাজের কর্মসংস্থান সংকট, কৃষকদের সমস্যা, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো দেশের প্রকৃত ও মৌলিক সমস্যাগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চলেছে। দেশের মূলধারার গণমাধ্যমকে প্রায়শই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্মীয় বিবাদ এবং সাম্প্রদায়িক বিতর্কের দিকে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা সমাজকে বিভক্ত করে এবং মূল বিষয় থেকে জনগণের মনোযোগ সম্পূর্ণ সরিয়ে দেয়। নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আজ যদি ক্ষমতার দাপটে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের অধিকার লঙ্ঘন করা যায়, তবে আগামীকাল অন্য যেকোনো সম্প্রদায়ের সাথেও একই ফ্যাসিবাদী মনোভাব গ্রহণ করা হতে পারে। ইতিহাস সাক্ষী যে, ঘৃণা দিয়ে কখনো টেকসই জাতি গঠিত হয় না, ঘৃণাই সমাজ ও জাতিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়। এই বাস্তবতায় নীরব দর্শক হয়ে না থেকে দেশের সংবিধানের মৌলিক নীতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় ঐক্য রক্ষা করার জন্য ভারতের সকল রাজনৈতিক দল, সংসদ সদস্য, বুদ্ধিজীবী এবং সুশীল সমাজকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দ।
টিএইচএ/
