আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের আপত্তির কারণে বাংলাদেশে নেপালের অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির পরিকল্পনা আপাতত আটকে গেছে। ফলে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আজ সোমবার (১৫ জুন) থেকে বাংলাদেশে কেবল পূর্বনির্ধারিত ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে নেপাল।
গতকাল রবিবার (১৪ জুন) কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
নেপালের জ্বালানি কর্মকর্তারা জানান, ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ (সিইএ) সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার অজুহাতে এই বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন আটকে দিয়েছে। তাদের মতে, এই অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আনতে হলে একটি সংশোধিত বা নতুন ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এবং নেপাল-ভারত জ্বালানি সচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির (জেএসসি) সিদ্ধান্তসহ আরও বেশকিছু আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বাকি রয়েছে। সাধারণত নেপাল বর্ষা মৌসুমে ভারত ও বাংলাদেশে তাদের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ রপ্তানি করে থাকে এবং শীতকালে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে। সেই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২৭ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক জেএসসি বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াটের পাশাপাশি অতিরিক্ত আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এরপর নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ (এনইএ) এই প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য ভারতের এনটিপিসি বিদ্যুৎ বাণিজ্য সংস্থা নিগম লিমিটেডকে (এনভিভিএন) অনুরোধ জানায়। কিন্তু এনভিভিএন জানায়, ১ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার ভারত-বাংলাদেশ বিদ্যুৎ আদান-প্রদান লাইনটি দিয়ে এই মুহূর্তে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
এনইএ’র বিদ্যুৎ বাণিজ্য বিভাগের পরিচালক তর্ক বাহাদুর থাপা সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে জানান, এবার বাংলাদেশে কেবল আগের নির্ধারিত ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করা হবে। অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াটের জন্য ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এখনও সম্পন্ন না হলেও আগের ব্যবস্থার মতো ভারতের সিইএতে এনভিভিএনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে সঞ্চালন লাইনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা নেই বলে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নেপালে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আসন্ন নেপাল-ভারত জেএসসি বৈঠক এবং সচিব পর্যায়ের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠক থেকে নতুন সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হবে। তবে এই বৈঠকগুলোর সময়সূচি এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি।
বাংলাদেশে চলমান ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির ব্যবস্থাটি গত বছরের ৫ জানুয়ারি নেপাল-ভারত জেএসসি বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়েছিল। এরপর একই বছরের ২ অক্টোবরে নেপাল ও বাংলাদেশের জেএসসি বৈঠকে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সম্মতি আসে এবং পরের দিন এনইএ, বিপিডিবি ও এনভিভিএনের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির অধীনে প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করার কথা রয়েছে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াটের জন্য নেপাল-ভারত জেএসসিতে আরও আলোচনার পাশাপাশি ভারতের সিইএ থেকে অনুমোদনের পর একটি নতুন ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করতে হবে। এই চুক্তি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ রপ্তানি বেড়ে ৬০ মেগাওয়াটে দাঁড়াবে।
এর আগে গত বছরের ১৫ নভেম্বর নেপাল প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে ১২ ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছিল। নেপালের এই বিদ্যুৎ ভারতের অভ্যন্তরে ঢালকেবার-মুজাফফরপুর ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয় এবং তারপর বহরমপুর-ভেড়ামারা ৪০০ কেভি লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপাল প্রতি ইউনিট ৬ দশমিক ৪০ মার্কিন সেন্ট দামে বাংলাদেশের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করছে এবং অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াটের ক্ষেত্রেও এই দাম প্রযোজ্য হবে। এ পর্যন্ত নেপাল ভারত ও বাংলাদেশে সম্মিলিতভাবে মোট ১ হাজার ১৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে। ভারতের বাজারে ইন্ডিয়ান এনার্জি এক্সচেঞ্জের (আইইএক্স) মাধ্যমে ডে-অহেড এবং রিয়েলটাইম মার্কেটে প্রতিযোগিতামূলক দরে বিদ্যুৎ বিক্রি করা হয়। নেপাল এনভিভিএনের সঙ্গে একটি মাঝারি মেয়াদি চুক্তির অধীনেও বিদ্যুৎ বিক্রি করে। ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্য ভারতীয় রুপিতে পরিচালিত হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে লেনদেন হয় মার্কিন ডলারে। ২০২১ সালের অক্টোবরে ভারত প্রথমবারের মতো নেপাল থেকে ৩৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির অনুমোদন দেয়। এরপর থেকে ভারতে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন সুরক্ষিত করেছে নেপাল। চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে নেপাল ভারত ও বাংলাদেশে ২০ দশমিক ৯৯৫২ বিলিয়ন রুপির বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৩ দশমিক ১০৩৩ বিলিয়ন রুপি।
টিএইচএ/
